Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

বিষ্ণু মন্দির ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছিল ত্রিবেণীর জাফর খান গাজী মসজিদ





© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

মধ্যযুগের বহিরাগত ইসলাম শাসনে হিন্দু মন্দির ভেঙে মসজিদ বা দরগাতে  পরিণত করার ঘটনা নতুন কিছু নয় । সারা ভারতে অসংখ্য মন্দিরকে বিধর্মী শাসক মসজিদে পরিণত করেছে ।একদিকে  ছলে-বলে-কৌশলে প্রজাদের ধর্মান্তরকরণ, আর  অন্যদিকে উপাসনা গৃহ এবং তৎসংলগ্ন জমি দখল করে মসজিদ নির্মাণ -  এই দুই উপায়ে ভারতকে দার - উল-  ইসলামে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে মধ্যযুগের মুসলিম শাসকরা।  সঙ্গে যোগ্য সহায়তা প্রদান  করেছেন মুসলিম পীর - ফকির আর সেকালের অর্থলোভী কিছু হিন্দু বুদ্ধিজীবী ( কবি,  সাহিত্যিক ) এবং উচ্চপদস্থ হিন্দু কর্মচারীরা।  আজকের ভারতেও এই সকল ইসলাম হিতৈষী কিন্তু জন্মসূত্রে হিন্দু -  এইরকম বুদ্ধিজীবী এবং রাজকর্মচারীর অস্তিত্ব কিছু কম নয়।  আরে এনাদের জন্যই আজ হিন্দু ভূমি ভারতে হিন্দুত্ব বাদ সাম্প্রদায়িকতা নামে অভিহিত হচ্ছে। 



সারা ভারতের ন্যায় বাংলাতেও ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিক থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলেছিল বহিরাগত মুসলিম শাসকদের শাসন। বহিরাগত মুসলিম সেনাপতি বখতিয়ার খোলজি নদীয়া দখল করেন 1206 খ্রিস্টাব্দে। সেই শুরু । তারপর থেকে 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে দুশ্চরিত্র নবাব সিরাজের পতন  পর্যন্ত বাংলা ছিল মুসলিম শাসনাধীন।



এই বিরাট কালখণ্ডে ( প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর ) উত্তরবঙ্গের রাজা গণেশ,  যশোরের প্রতাপাদিত্য রায় কিংবা ভুরশুট রাজ্যের ( বর্তমান হাওড়া - হুগলী অঞ্চল ) রানী  ভবশঙ্করীর মত মুষ্টিমেয় কিছু হিন্দু শাসক রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তুর্কি -  মুঘল শাসকদের বিরুদ্ধে । কিন্তু সেই প্রতিরোধ যথেষ্ট ছিল না । বাংলার অধিকাংশ স্থানেই চলেছিল মুসলিম শাসকদের শাসন এবং বাংলাকে দার-  উল-  ইসলামে পরিণত করার প্রয়াস।  আজকের দিনে আমরা দেখতে পাই অধিকাংশ বাংলাভাষী (পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ নিয়ে) হিন্দুত্ব ত্যাগ করে ইসলামকে কবুল করেছে এবং বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার হিন্দু মন্দির মসজিদে পরিণত হয়েছে এটা সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসকদের প্রয়াস এর ফলেই সম্ভব হয়েছে।


ছবি: মসজিদের দেওয়ালে হিন্দু ধর্মের চিহ্ন


 এই নিবন্ধে আলোচিত হবে এই রকমই এক মসজিদের কথা যা আসলে একটি বিষ্ণুমন্দির ছিল বলে জানা যায়।

 এই মসজিদের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ত্রিবেণী নামক স্থানে । এই মসজিদের নাম হল জাফর খান গাজী মসজিদ । এটি যে আসলে একটি হিন্দু মন্দির ছিল, সেই বিষয়ে প্রমাণ গুলি আলোচনার পূর্বে পাঠকের জানা দরকার গাজী শব্দের অর্থ । _গাজী_ একটি আরবি শব্দ যার উৎপত্তি _গজওয়া_ শব্দ থেকে। _গজওয়া_শব্দের অর্থ হল যুদ্ধ বা জিহাদ।  ইসলাম যোদ্ধা জিহাদে জয়ী হলে তাকে গাজী উপাধি দেওয়া হয়,  আর হেরে গেলে সে হয় শহীদ।  জাফর খান ছিলেন দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহের সেনাপতি। তিনি বাংলায় তুর্কি আক্রমণের নেতৃত্ব দেন । স্থানীয় হিন্দু শাসককে পরাজিত করে বাংলায় তুর্কি শাসন পত্তন করেন । কথিত আছে হুগলির ত্রিবেণীর (গঙ্গা যমুনা সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থল) প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে জাফর খান সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। মসজিদটি নির্মাণ হয় আনুমানিক 1297 খ্রিস্টাব্দে।  প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই মসজিদ বাংলার প্রাচীনতম মসজিদ গুলির মধ্যে একটি। এই মসজিদটি এমন একটি স্থানে নির্মিত যেটি হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র (যেহেতু তিনটি পবিত্র নদীর সঙ্গমস্থল )। মনে রাখতে হবে একসময় এই ত্রিবেণীতে কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হত যা এই বছর থেকে আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। তাই মসজিদ স্বপনের জন্য এই স্থান কি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্যই বেছে নেওয়া হয়েছিল কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। যাই হোক , জাফর খান প্রাথমিক ভাবে হিন্দু শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় পেলেও পরে হুগলির রাজা ভূদেবের কাছে যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হন। কথিত আছে জাফর খানের হত্যার পর তাঁর মাথা এতগুলো টুকরো হয়ে গিয়েছিল যে সেটা আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তখন তাঁর দেহ নিয়ে এসে এই মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। 

ছবি: মসজিদের দেওয়ালের অন্য অংশে হিন্দু ধর্মের চিহ্ন


জাফর খানের মৃত্যুর পর তাঁকে  যে স্থানে সমাহিত করা হয়,  সেখানে আরবি ভাষায় কিছু ফলক লেখা রয়েছে।  ব্রিটিশ অফিসার H. Balochman এই লেখাগুলোর ইংরেজি অনুবাদ করেন। অনুবাদটি এইরূপ - Khan the lion of lions has appeared by conquering the towns of India in every expedition and by restoring the decayed religious institutions.  And he has destroyed the obdurate among the infidels with his sword and  spear and lavish the treasures of is wealth in helping miserable. এর বাংলা অনুবাদ করলে হয় - _সিংহদের মধ্যে সিংহ জাফর খান প্রতি অভিযানে একের পর এক ভারতীয় নগর জয় করেন এবং ধর্মীয় স্থান গুলির নতুন রূপ দেন। অনমনীয় মনোভাবের অবিশ্বাসীদের তিনি তরবারি ও বর্শার দ্বারা হত্যা করেন এবং ধন-দৌলত দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে তাদের সাহায্য করেন।

ছবি: মসজিদের দেওয়ালে লেখা বৈদিক মন্ত্র


বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের আরেকজন ব্রিটিশ অফিসার D Money জাফর খান গাজীর সমাধির কর্মচারী বা খাদেমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সময়টা ছিল 1847 খ্রিস্টাব্দ।  তিনি খাদেমদের দেওয়া কিছু নথি ভালোভাবে পরীক্ষা করে জানান জাফর খান গাজী তাঁর ভাগ্নে শাহ সুফীর সঙ্গে পশ্চিম ভারত থেকে বাংলায় আসেন এখানকার অবিশ্বাসীদের হত্যা করার জন্য এবং বাংলার লোকেদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্য।  এই নথি থেকে জানতে পারা যায় যে জাফর খান যুদ্ধ  লড়েন এবং স্থানীয় শাসক তথা সপ্তগ্রামের রাজা মান -  নৃপতিকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেন । তবে প্রারম্ভিক যুদ্ধে জাফর খানের জয় হলেও হুগলির রাজা ভুদেবের কাছে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। 

ছবি: মসজিদের অন্য একটি দেওয়ালে হিন্দু ধর্মের চিহ্ন


জাফর খানের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ যেখানে সমাধিস্থ হয়,  সেই স্থানে যে একটি প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির ছিল  সেটি সমাধি প্রাঙ্গণ দেখলেই বোঝা যায়।  এই সমাধির মূল প্রবেশদ্বার , স্তম্ভ ও  দেওয়ালে হিন্দু স্থাপত্যের অনেক নিদর্শন বর্তমান । সমাধি প্রাঙ্গণে যে মসজিদ রয়েছে তার প্রবেশদ্বার পুরোপুরিভাবে হিন্দু স্থাপত্যের প্রমাণ বহন করছে । তার দেওয়ালে রয়েছে পবিত্র মঙ্গলঘটের নকশা। দেওয়ালের উপর বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন বর্তমান,  যা দেখে বোঝা যায় মন্দিরের দেওয়ালের নকশা ধ্বংস করার জন্য জাফর খান এবং তার সৈন্যরা তরবারি চালান। মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালে দেখতে পাওয়া যায় শিকল এবং ঝুলন্ত ফুলের নকশা যা হিন্দু মন্দিরে দেখা যায়। আরেকটি দেওয়ালে দেখা যায় শিকল থেকে ঝুলন্ত বাতি।  মসজিদের পিছনে রয়েছে মন্দিরের ভাঙ্গা স্তম্ভ। মসজিদের  দরজার ফ্রেমেও দেখা যায় মন্দিরের স্থাপত্য নিদর্শন ।পশ্চিম দিকে একস্থানে মন্দিরের মুখ ইট দিয়ে চাপা দিয়ে লুকোনোর চেষ্টা করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ এবং পশ্চিমে মন্দিরের দরজাও দেখতে পাওয়া যায় । আশ্চর্যজনকভাবে মসজিদের একটি দেওয়ালে আমরা স্বস্তিকা এবং বৈদিক অনাহত চক্র দেখতে পাই । প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে অনাহত চক্র হল নৃত্যরত  নটরাজের প্রতীক।  এছাড়াও জাফর খান গাজীর মসজিদের দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে  দেবনাগরী অক্ষর , রামায়ণ ও শ্রীকৃষ্ণের কাহিনীর বর্ণনা এবং বিষ্ণুর দশ অবতারের মূর্তি। এই নিদর্শনগুলি প্রমাণ করে দেয় যে এই স্থানে একটি বিষ্ণুমন্দির ছিল মহেঞ্জোদারো -  হরপ্পা আবিষ্কারক বিখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও মনে করেন এই স্থানে একটি বিষ্ণু মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। 

ছবি: মসজিদের একটি দরজা

আজকের ভারত নিজের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অনুসন্ধান করে নিজ জাতিসত্তাকে বিশ্বের চোখে উন্নত করার প্রয়াসে রত। মন্দির ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য আর মসজিদের ধারণা এসেছে বিদেশ থেকে। তার অর্থ এই নয় যে ভারতে মসজিদ থাকবে না : কিন্তু তাই বলে প্রাচীন ঐতিহ্যশালী মন্দিরকে মসজিদে পরিণত করার প্রয়াস নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য দখলদারি মানসিকতার প্রকাশ। একই রকম নিন্দনীয় সেইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী যাঁরা এইসব মসজিদকে সম্প্রীতির নিদর্শন এবং মন্দিরকে মসজিদে পরিণতকারী বহিরাগত হানাদারদের ইতিহাসে নায়কের স্থানে বসিয়েছেন । জাফর খান গাজীর ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগের ব্যতিক্রম হয়নি। একদল বাঙালি বুদ্ধিজীবী জাফর খান গাজীকে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ধারক এবং বাহক ও গরিবের মসিহা রুপে তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে জাফর খান গাজী মা গঙ্গাকে শ্রদ্ধা করতেন, সংস্কৃত ভাষা চর্চা করতেন!  এমনকি সংস্কৃত ভাষায় মা গঙ্গাকেকে নিয়ে কাব্য রচনা করেন ! তাঁর প্রতিষ্ঠিত মসজিদের স্থাপত্য  হিন্দু - মুসলমান ঐক্যের বাহক ! এইবার পাঠক চিন্তা করুন,  জাফর খান গাজী  হিন্দু সংস্কৃতি এত ভালবাসতেন যে তিনি মসজিদের দেওয়ালে দেবনাগরী হরফ,  রামায়ণ,  শ্রীকৃষ্ণের জীবন কাহিনী , দশাবতারের মূর্তি ইত্যাদি খোদাই করান । আবার সেই জাফর খানই পশ্চিম ভারত থেকে এসে সপ্তগ্রামের হিন্দু রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেন । সেই জাফর খানের উপাধি হয় গাজী এবং তাঁর সমাধিতে আরবী ভাষায় লেখা থাকে যে তিনি তরবারি আর বর্শার দ্বারা বহু বিধর্মী বা অবিশ্বাসীকে হত্যা করেছেন ! তাহলে কোন জাফর খানকে আমরা সত্য বলে ধরব ? একজন গাজী কি কোনদিন হিন্দু - মুসলিম  সম্প্রীতির ধারক হতে পারেন ? একজন জিহাদী কি কখনো ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মকে আজ অবধি শ্রদ্ধা করেছেন ? উত্তর বুঝে নেবার দায়িত্ত্ব পাঠকের। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কখনোই  হিন্দুদের জাফর খান গাজীর মসজিদ ভেঙে প্রতিশোধ নিতে উৎসাহিত করা নয় : বরং সত্য ইতিহাসকে হিন্দু - মুসলমান  সকলের সম্মুখে তুলে ধরা। আমাদের মনে রাখতে হবে আজ যেসকল ইসলাম ধর্মালম্বী  ভারতে থাকছেন , তাঁরা কোন  মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর স্পর্ধা করেন নি। হয়তো বহিরাগত জাফর খান যখন মন্দিরকে মসজিদে পরিণত করেন, তখন আজকের অনেক মুসলিমের পূর্ব পুরুষও  হিন্দু ছিলেন এবং প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন । তাই তাঁরা যদি আজকে জাফর খানকে সমর্থন করে মিথ্যা তথ্য ও যুক্তিজাল দিয়ে  খান সাহেব কৃত অন্যায়কে আড়াল করতে চান , সেটা মূর্খতার নামান্তর এবং নিজ পূর্ব পুরুষের গায়ে থুতু দেবার সমকক্ষ হবে। আর যেই সব তথাকথিত সেক্যুলার পন্ডিত এত কিছুর পরও  জাফর খানকে সম্প্রীতির ধারক বলে বর্ণনা করেন , তাঁদের মস্তিষ্কের সুস্থতা এবং নিজ দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যথেষ্ট সন্দেহজনক। মনে রাখতে হবে এই বাংলা থেকেই দাবি উঠেছিল - চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। এনারা এই দেশ বিরোধী সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক। 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom