Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

রামায়ণ কথা- মাতা শবরী



© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

পম্পা সরোবরের তীর। পদ্মকুমুদ শোভিত, মৎস সমাকুল, পম্পা সরোবর। ব্রহ্মা  সৃষ্ট ঋষ্যমুখ পর্বতের তীরে অবস্থিত এই পম্পা সরোবর। এর তীরবর্তী গাছপালা অতি সুদৃশ, বৃক্ষরাজি ঊর্ধে তাদের শাখা – প্রশাখা বিস্তার করেছে এমনভাবে যে দূর থেকে তাদের দেখলে শিখরযুক্ত পর্বত বলে ভ্রম হয়। এই বৃক্ষের ডালে ডালে বিভিন্ন ধরণের  ফুল, কতকফুল ডালে আর কতক মাটিতে পরে  নির্মল বাতাসের প্রবাহে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ভ্রমণরত। সর্বত্র পাখীর 

কূজন, দূরে বননির্ঝরের মনোমুগ্ধকর শব্দ চিত্ত ব্যাকুল করে। ভ্রমরের গুঞ্জন  আর পাতার মর্মর ধ্বনি এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরী করে। পম্পার জল বৈদূর্যমণির ন্যায় নির্মল। 

এই সরোবরের পশ্চিমপারের এক আশ্রমে বাস করেন মাতা শবরী। তিনি মতঙ্গ মুনির শিষ্যা। মতঙ্গ মুনি এক ধর্মপরায়ণ  মুনি। শবরী ছিলেন মতঙ্গ মুনি আর তাঁর শিষ্যদের পরিচারিকা । বর্ণগত  ভাবে তিনি ছিলেন নিম্নবর্ণের  (শবর ), কিন্তু তাঁর মনে ভক্তি ছিল প্রবল। তিনি তাঁর সমস্ত মন দিয়ে তাঁর গুরু মতঙ্গ মুনি ও তাঁর শিষ্যদের সেবা করতেন। মতঙ্গ মুনি শবরীর সেবায় তাঁর উপর তুষ্ট ছিলেন। তিনি স্বর্গারোহণের  পূর্বে তাঁর এই শিষ্যাকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন যে ভগবাণ বিষ্ণু যখন শ্রীরাম এর অবতার গ্রহণ  করে তাঁর পত্নী সীতার অন্বেষণে  দন্ডকারণ্যে  আসবেন, তখন তিনি শবরীর অতিথ্য গ্রহন করবেন। তিনি শবরীকে সেই কারনে এই আশ্রমে শ্রীরামের না আসা পর্যন্ত   প্রতীক্ষা করতে  নির্দেশ দেন।

 শ্রীরামের সঙ্গে সাক্ষাৎলাভই ছিল শবরীর ইষ্টলাভ।

মতঙ্গ মুনির অমৃতলোক যাত্রার পরও তাঁর আশ্রমে তাঁর শিষ্যরা থাকতেন আর শবরী তাঁদের সেবা করতেন। একদিন শ্রীরামের জন্ম হল। পিতৃসত্য পালনের জন্য শ্রীরাম একদিন বনবাসও গ্রহণ  করলেন। যেদিন শ্রীরাম, সীতা ও লক্ষণ সহ চিত্রকূটে আগমন করলেন, সেদিন মতঙ্গ মুনির আশ্রমের অন্য তপস্বীরাও স্বর্গারোহণ  করলেন। একা মাতা শবরীই অপেক্ষা করতে লাগলেন প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।

রাবণের সীতাহরণের পর শ্রীরাম ও লক্ষণ উদভ্রান্তের ন্যায় দন্ডকারণ্যে  সীতা অন্বেষন করতে লাগলেন। দন্ডকারণ্যে  ঘুরতে ঘুরতেই একদিন তাঁদের সাক্ষাৎ হল এক শাপিত কবন্ধের সঙ্গে। কবন্ধ আসলে শ্রী নামক দানবের পুত্র দনু। দনু বনবাসী ঋষিদের রাক্ষস রূপে ভয় দেখাত। স্থূলশিরা নামক ঋষির অভিশাপে তাই তিনি কুৎসিত রূপ ধারণ  করেন। ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর মস্তক শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে তিনি কবন্ধ রূপে বিরাজমান ছিলেন। 

তাঁর অনুরোধে শ্রীরাম ও লক্ষণ তাঁর দেহের অগ্নিসংস্কার করলে দনু তাঁর পূর্বরূপে ফিরে যান আর মাতা শবরীর খোঁজ দেন। তিনি শ্রীরামকে বলেন,

 “শবরী নামে এক শ্রমনী এখনও মতঙ্গ মুনির আশ্রমে বর্তমান। ঐ ধর্মশীলা সন্ন্যাসিনী তোমাকে দর্শন করে স্বর্গলোকে যাবেন। রাম, তুমি পম্পার পশ্চিম দিকে গেলে মতঙ্গ মুনির আশ্রম দেখতে পাবে”। 

এই বলে দনু পুণ্যলোকে প্রস্থান করলেন। 

দনুর কথামত শ্রীরাম ও লক্ষণ পম্পার পশ্চিম তীরে মতঙ্গ মুনির আশ্রমে পদার্পণ  করলেন। শিষ্যা শবরী শ্রীরামের প্রতীক্ষায় রোজ পম্পাতীরজাত বৃক্ষ থেকে ফল সংগ্রহ করে রাখতেন। প্রভুকে সুমিষ্ট ফল দিয়ে আতিথ্য করাই ছিল এই শ্রমনীর উদ্দেশ্য। তাই প্রতিটা ফলেরই তিনি স্বাদগ্রহণ  করতেন। যে ফলগুলি মিষ্ট হত, শুধু সেগুলিই তিনি প্রভুকে আপ্যায়ন করার জন্য সযত্নে রেখে দিতেন।

শ্রীরাম ও লক্ষণ বনবাসী বেশে যখন সেই বৃদ্ধা শবরীর আশ্রমে পদার্পন করলেন,  তখন শ্রমনী আনন্দে বিহ্বল হলেন। বাকরুদ্ধা হয়ে তিনি বারে বারে প্রনাম করতে লাগলেন। 

শিষ্যা তাঁদের চরন বন্দনা করলেন, পাদ্য আচমনীয় দিয়ে তাঁদের সম্মান করলেন। তিনি শ্রীরামকে বিবিধ বন্য উপহারও দিলেন, আর ক্ষুধা নিবৃত করার জন্য দিলেন তাঁর সংগ্রীহিত বন্য ফল।

 প্রত্যেকটি ফলই ছিল পূর্বে স্বাদগ্রহণ  করা এবং খাওয়া।

লক্ষণ তাই সেগুলি খেতে ইতঃস্তত করেছিলেন। শ্রীরাম কিন্তু ভক্তের আবেদনে সাড়া দিয়ে , সেই এঁটো ফলই সাগ্রহে গ্রহণ  করছিলেন। তিনি লক্ষণকেও সেই সুমিষ্ট ফল গ্রহণ  করতে বললেন। লক্ষণের কাছে শ্রীরাম শুধু অগ্রজই নয়, তাঁর স্বামীও বটে। তাই তিনিও সেই ফল ভক্ষন করলেন।

শ্রীরাম বৃদ্ধা শবরীকে তাঁর তপস্যা, গুরুদেব ও নিয়মপালন বিষয়ে প্রশ্নও করলেন। মাতা জানালেন শ্রীরামের সঙ্গে সাক্ষাতেই তাঁর গুরুসেবা, তপস্যা ও জন্ম সফল হয়েছে। শ্রীরামের প্রসাদেই তিনি মুক্তি লাভ করবেন।

এরপর বৃদ্ধা শবরী শ্রীরামকে তাঁর গুরুর সাধনাস্থল, মতঙ্গ মুনি ও তাঁর শিষ্যদের বল্কল যা তাঁরা পরিধান করতেন। তাঁদের পূজার পুষ্প ও মতঙ্গ বন শ্রীরামকে দেখালেন।

শ্রীরামের দর্শন শেষ হলে মাতা শবরী প্রভুর থেকে কলেবর ত্যাগের আজ্ঞা চাইলেন। শ্রীরাম তাকে দেহত্যাগের নির্দেশ দিলে, সেই জটাবতী চির-অজিন ধারিণী  অগ্নিতে দেহ আহুতি দিয়ে দিব্যরূপে স্বর্গালোকে মহর্ষিদের কাছে গমন করলেন।

এই ঘটনা বাল্মীকি রামায়ণের অরণ্য কাণ্ডের চুয়াত্তর ও পঁচাত্তর সর্গে বর্ণিত হয়েছে।


এই ঘটনা আমাদের শেখায়  কুল, সম্পদ, বল এমনকী গুণও নয়, ভক্তিই হল প্রভুকে লাভ করার একমাত্র পথ l তাই আমাদেরও উচিত ভক্তির দ্বারা ঈশ্বর সাধনা যা আমাদের চিত্তশুদ্ধি করবে l ঈশ্বরকে পেতে  যে প্রবল ধৈর্য আর অধ্যাবসায়  লাগে তা শবরীর ঘটনা প্রমান করে l

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom