Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

আচার্য বৌধায়ন ও প্রাচীন গণিতচর্চা: যজ্ঞবেদি থেকে ত্রিকোণমিতি

 


© শ্রী অনিক কুমার সাহা


আচার্য বৌধায়ন ছিলেন খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ শতকের একজন ভারতীয় গণিতবিদ যিনি প্রায় ৩ হাজার বছর আগেই গণিতের অপর অভূতপূর্ব কাজ করে গেছেন। তাঁর বৌধায়ন সূত্র নামক একটি অসাধারণ গ্রন্থ রয়েছে। গবেষকদের মতে 

বৌধায়ন সূত্রের সূত্রগুলো কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তরিয় শাখার কল্পসূত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তিনি ছিলেন একজন বৈদিক পরম্পরার ঋষি তাই বৈদিক শাস্ত্রমতে যজ্ঞবেদি নির্মাণের নিখুঁত মাপঝোঁককে মাথায় রেখে তিনি শুল্বসূত্র নামক গ্রন্থ রচনা করেন যা পরবর্তীতে ত্রিকোণমিতির চর্চাকে অনেকদূর নিয়ে যায়। বৈদিক কল্পসূত্রসমূহের মধ্যে বৌধায়ন গৃহ্যসূত্র, বৌধায়ন ধর্মসূত্র, বৌধায়ন শুল্বসূত্র, বৌধায়ন শ্রৌতসূত্র রয়েছে।


তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদান রাখেন গণিতশাস্ত্রে।

তিনি প্রায় নির্ভুল ভাবে পাই (π)-এর মান নির্ণয় করেছিলেন এবং পিথাগোরাসেরও জন্মের কয়েকশো বছর আগে একই উপপাদ্যের একটি আলাদা সমাধান দেখান। আধুনিক গণিতে দেখা যায় সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রে লম্ব, ভূমি ও অতিভুজের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে তাকে পিথাগোরাসের উপপাদ্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রমতে যজ্ঞবেদি কিংবা মন্দির নির্মাণের মাপঝোঁক কর‍তে গিয়ে  

আচার্য বৌধায়ন প্রথম লক্ষ্য করেন যে সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রে লম্ব, ভূমি ও অতিভুজের মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে। আর ত্রিভুজের আকার যতই বড় বা ছোট হোক না কেন এই সম্পর্কটি সব ক্ষেত্রেই এক থাকে। 


বৌধায়ন সূত্র এবং শুল্বসূত্রে তিনি লিখেছেন,


"दीर्घचतुरश्रस्याक्ष्णया रज्जुः पार्श्वमानी तिर्यग् मानी।

च यत् पृथग् भूते कुरूतस्तदुभयं करोति ॥"


(দীর্ঘচতুরশ্রস্যাক্ষ্ণয়া রজ্জুঃ পার্শ্বমানী তির্যম্ মানী।

চ যৎ পৃথগ্ ভূতে কুরুতস্তদুভয়ং করোতি॥) 


অর্থাৎ, একটি দড়ি দৈর্ঘ্য বরাবর প্রসারিত তির্যক একটি উৎপাদন করে এলাকায় যা উল্লম্ব এবং অনুভূমিক পক্ষের একসঙ্গে আছে।


এটিই পিথাগোরাসের উপপাদ্যের প্রাথমিক ও আদি সমাধান। 


আচার্য বৌধায়ন যখন বৈদিক যজ্ঞবেদি বা মন্দির নির্মণের ক্ষেত্রে কোণের নিখুঁত পরিমাপ করতে চেষ্টা করেন তখন লম্ব, ভূমি ও অতিভুজের দীর্ঘের অনুপাতের সাহায্যে তিনি সঠিক কোণ ও কোণের মানের সাহায্যে লম্ব, ভূমি ও অতিভুজের দীর্ঘের অনুপাত নির্ণয় করার পদ্ধতি তৈরি করেন। এভাবেই আচার্য বৌধায়নের হাত ধরে সর্বপ্রথম ত্রিকোণমিতির যাত্রা শুরু হয় এবং এই পদ্ধতি থেকেই পরবর্তী সময় Sin, Cos, Tan এর ধারণাগুলো আসে। 


কিন্তু এই ভাবে অনুপাত নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তিনি দেখলেন কিছু ক্ষেত্রে এই অনুপাত গুলির মান আসছে অমূলদ সংখ্যা তথা √২ বা √৩। কিন্তু এই ধরণের অমূলদ সংখ্যার মান নির্ণয় করা সাধারণভাবে সম্ভব নয়। আচার্য বৌধায়ন এই ধরনের অমূলদ সংখ্যার মান সঠিক ভাবে নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নিজের একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই পদ্ধতি দ্বারা '√২' এর মান আসে ১.৪১৪২১৬ যা বর্তমানে নির্ণয় করা মানের সাথে দশমিকের পর ৫ ঘর পর্যন্ত মিলে যায়। 


যজ্ঞবেদি বা মন্দিরের কৌণিক বিন্দু নির্ণয়ে শুধু ত্রিভুজ নয় সাথে বৃত্ত সম্পর্কেও সঠিক ধারনা দরকার হয়। বৃত্ত নিয়ে কাজ করলে পাই (π)-এর সঠিক মান নির্ণয় প্রয়োজন। কিন্তু পাই (π)-এর মান নির্ণয় করা এতো সহজ বিষয় ছিলনা। তবে আচার্য বৌধায়ন এই পাই (π) -এর মান নির্ণয় করেন একেবারে অন্য পদ্ধতিতে। তিনি পাই (π) -এর মান নির্ণয় করতে বৃত্ত নয় বরং চতুর্ভুজকে ব্যবহার করেন। চতুর্ভুজের কর্ণকে বৃত্তের ব্যাস ধরে তিনি সেই তৈরি হওয়া বৃত্তের পরিধির তুলনা করে তিনি পাইয়ের মান দেখান ৩। তবে তিনি ৩ দশমিকের পর আরও কিছু আনুমানিক মান দেখান যা পঞ্চম শতকের বৈদিক আচার্য অার্যভট্টের নির্ণীত মান 3.1416 (প্রায়) এর খুব কাছাকাছি। 


চতুর্ভুজ ও বৃত্ত নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অাচার্য বৌধায়ন আরেকটি জটিল সমস্যার সমাধান করেছিলেন যে এমন একটি বৃত্ত তৈরী করা যার ক্ষেত্রফল একটি বর্গের ক্ষেত্রফলের সমান হবে। একে বলা হয় "Cycling of the Square"।


আমরা হয়তো আচার্য বৌধায়নকে মনেই রাখি নি, এমনকি তাঁর রেখে যাওয়া বিশাল অবদানকেও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন করি নি। প্রাচীন ভারতে যখন জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা হতো ইউরোপের মানুষ তখন গুহাবাসী ছিলো অথচ ইউরোপ আজ কত এগিয়ে গেছে। এর কারণ তারা গুণীদের কদর করেছে আর আমরা গুণীদের ইতিহাস মুছে দিয়েছি।


তথ্যসূত্রঃ 

১/ বৌধায়ন শুল্বসূত্র

২/ Plofker, Kim (2007). Mathematics in India, 

৩/ Sacred Books of the East, vol.14 – Introduction to Baudhayana

৪/ Patrick Olivelle, Dharmasūtras: The Law Codes of Ancient India, (Oxford World Classics 1999)

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom