Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

বেদে বামন অবতার




© শ্রী কুশল বরণ চক্রবর্তী

ভগবান বিষ্ণুর চতুর্দশ অবতার বা দশ লীলা অবতারের অন্যতম বামন অবতার। বলিরাজের দর্প বিনাশ করতে ভগবান বিষ্ণু কশ্যমের ঔরসে অদিতির গর্ভে বামনরূপে অবতীর্ণ হন। বামন অবতারে ভগবান বলিরাজের যজ্ঞে আগমন করেন। বলিরাজের প্রার্থনায় ভগবান বিষ্ণু তাঁর কাছে মাত্র পদত্রয় ভূমি যাচনা করে। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের নিষেধ সত্ত্বেও বলিরাজ ভগবান বিষ্ণুর প্রার্থনা অনুসারে তাঁকে সামান্য ত্রিপাদ ভূমি প্রদান করলেন। তখন বামনরূপী ভগবান বিষ্ণু বিরাট অনন্তরূপ ধারণ করেন। তিনি একটি পা পৃথিবীতে স্থাপন করলেন এবং অন্য পা স্বর্গে।এভাবে দুটি পা দিয়ে তিনি স্বর্গ এবং মর্ত্যলোকে বিস্তার করলেন। অবশিষ্ট রইলো বলিরাজের প্রতিশ্রুত আরেক পা ভূমি। সেই পা বলিরাজ তাঁর মস্তকে স্থাপন করতে বললেন। সেই পা বলিরাজের মস্তকে স্থাপন করে, ভগবান বামন তাঁকে পাতালে প্রেরণ করেন। এই কাহিনীটি শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, বামন পুরাণ, বায়ু পুরাণ, হরিবংশ, বৃহদ্ধর্ম পুরাণ, দেবী পুরাণ, ব্রহ্ম পুরাণ, স্কন্দ পুরাণসহ বিবিধ শাস্ত্রে রয়েছে।ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতারে ত্রিপাদ ভূমির জন্য তিনবার পদক্ষেপের বিষয়টি বিভিন্ন পুরাণে যেমন বর্ণিত হয়েছে, তেমনি বেদেও ভগবান বিষ্ণুর তিন পদক্ষেপের প্রসঙ্গটি সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। 


অতো দেবা অবন্তু নো যতো বিষ্ণুর্বিচক্রমে। 

পৃথিব্যাঃ সপ্ত ধামভিঃ৷৷

ইদং বিষ্ণুর্বি চক্রমে ত্রেধা নি দধে পদম্।

সমূহ্লমস্য পাংসুরে ৷৷

ত্রীণি পদা বি চক্ৰমে বিষ্ণুর্গোপা অদাভ্যঃ। 

অতো ধর্মাণি ধারয়ন্ ॥

বিষ্ণোঃ কর্মাণি পশ্যত যতো ব্ৰতানি পম্পশে। 

ইন্দ্ৰস্য যুজ্যঃ সখা ৷।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:১৬-১৯)


"এ স্থান থেকে দেবগণ আমাদের রক্ষা করুন, যে স্থান হতে বিবিধ পাদবিক্ষেপ করে সপ্তছন্দঃ দ্বারা অথবা পৃথিবীর সপ্ত স্থানে বিষ্ণুদেব পরিক্রমা করেছিলেন।


এই বিষ্ণু সমগ্র জগৎ বিশেষভাবে পরিক্রমা করেছিলেন। তিনবার তিনি পাদবিক্ষেপ করেছিলেন। তাঁর পদচিহ্নের ধূলিতে সমগ্র জগৎ অন্তৰ্ভূত। 


বিষ্ণু তিনবার পদক্ষেপ করেছিলেন, তিনিই সকলের রক্ষাকর্তা, অপরের দ্বারা অনাহত; তিনি ধর্মের ধারণকর্তা। 


বিষ্ণুর কর্ম সকল অনুধাবন কর, যার কর্মের সাহায্যে যজমানগণ ব্রতানুষ্ঠানে সক্ষম হয়। সেই বিষ্ণু ইন্দ্রের অনুকূল মিত্র।"


ঋগ্বেদ সংহিতার অষ্টম মণ্ডলে দ্বিপদা ছন্দে বৈবস্বত মনু বলেছেন, দেবগণকে বা শুভ শক্তিকে আনন্দিত করতেই ভগবান বিষ্ণুর তিন পদক্ষেপ। 


ত্রীণ্যেক উরুগায়ো বিচক্ৰমে যত্র দেবাসো মদন্তি।।

(ঋগ্বেদ সংহিতা:৮.২৯.৭)


"বিষ্ণু বহুলোকের স্তুতিযোগ্য, তিনি দেবগণকে আনন্দিত করতে তিন পদক্ষেপ প্রদান করেছেন।"


ঋগ্বেদ সংহিতায় প্রথম মণ্ডলের ১৫৪ সূক্তে ঔচথ্যের পুত্র দীর্ঘতমা ঋষি ত্রিষ্টুপ্ ছন্দে বিষ্ণু দেবতার স্তোত্র করেছেন। সেই স্তোত্রে ভগবান বিষ্ণুর লোকপ্রসংশিত বীরত্বপূর্ণ তিন পদক্ষেপে সমস্ত ভুবনে অবস্থান সাথে সাথে ভয়ঙ্কর, হিংস্র, গিরিশায়ী দুর্গম স্থানে বিচরণশীল বলে অবিহিত করা হয়েছে।সূক্তটির কয়েকটি মন্ত্রে ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতার এবং নৃসিংহ অবতারে স্বরূপ ধরা পরে। বিষ্ণুসূক্তটির দ্বিতীয় মন্ত্রে বিষ্ণু শব্দের সাথে সাথে মন্ত্রে "ত্রিষু বিক্রমণেষ্বধিক্ষিয়ন্তি ভুবনানি বিশ্বা" বাক্য যেমন বামন অবতারকে নির্দেশ করে; তেমনি 'মৃগো', 'ভীমঃ', 'কুচরো গিরিষ্ঠাঃ' শব্দগুলো সুস্পষ্টভাবে ভগবান বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারকে নির্দেশ করে। সূক্তটিতে বিষ্ণুর ত্রি পদক্ষেপের কথা শুধু দ্বিতীয় মন্ত্রে নয়, প্রথম থেকে চতুর্থ সকল মন্ত্রেই রয়েছে।


বিষ্ণোর্ন কং বীর্যাণি প্র বোচং

যঃ পার্থিবানি বিমমে রজাংসি।

যো অস্কভায়দুত্তরং সধস্থং 

বিচক্ৰমাণস্ত্রেধোরুগায়ঃ ॥


প্র তদ্‌ বিষ্ণু স্তবতে বীর্যেণ

মৃগো ন ভীমঃ কুচরো গিরিষ্ঠাঃ । 

যস্যোরুষু ত্রিষু বিক্রমণেষ্বধি-

ক্ষিয়ন্তি ভুবনানি বিশ্বা ॥


প্র বিষ্ণবে শূষমেতু মন্ম 

গিরিক্ষিত উরুগায়ায় বৃষ্ণে। 

য ইদং দীর্ঘং প্রযতং সধস্থমেকো 

বিমমে ত্রিভিরিৎ পদেভিঃ॥


যস্য ত্রী পূর্ণা মধুনা পদান্য-

ক্ষীয়মাণা স্বধয়া মদন্তি ।

য উ ত্রিধাতু পৃথিবীমুত 

দ্যামেকো দাধার ভুবনানি বিশ্বা ॥

(ঋগ্বেদ সংহিতা: ১. ১৫৪.১-৪)


" আমি বিষ্ণুর বীরকর্মসকল শীঘ্র বর্ণনা করব, যে বিষ্ণু পৃথিবী সম্পর্কিত পার্থিব বিষয় বিশেষভাবে নির্মাণ করেছেন, যিনি সহাবস্থানের উচ্চতম আসনকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছেন, তিনবার পদক্ষেপ করতে করতে যিনি বিস্তীর্ণ স্থানে গমন করেন। 


সেই বিষ্ণু বীরত্ব বীর্যসূচক কর্মহেতু জগতে স্তুত হয়ে থাকেন। বিষ্ণুর তিন পদক্ষেপে সমস্ত ভুবনে অবস্থান করে আছেন; এতেই সকল প্রাণী জীবিত থাকে।আবার তিনি ভয়ঙ্কর, হিংস্র, গিরিশায়ী দুর্গম স্থানে বিচরণশীল। অর্থাৎ বিষ্ণুর শান্ত এবং উগ্র উভয়রূপ বিরাজমান। 


লোকপ্রশংসিত মহাবল বিষ্ণু এ স্তোত্রসমূহ গ্রহণ করুক। তিনি ফলবর্ষণকারী বৃষভ, তিনি পর্বতবাসী, তিনি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হয়ে ভ্রমণকারী। সেই বিষ্ণু তিনটিমাত্র পদক্ষেপ দ্বারা এই দীর্ঘ, অতিবিস্তৃত সকলের বাসস্থান পরিমাপ করেছেন।


যাঁর তিনটি পদক্ষেপ মাধুর্য্য পূর্ণ, অজর এবং নিজ বলে উৎফুল্ল হয়ে থাকে; যিনি একাকী ত্রিপ্রকার অবয়ববিশিষ্ট দ্যুলোক ও ভূলোক এবং সকল প্রাণিজগৎকে ধারণ করে রাখেন।"


ভগবান বিষ্ণুর তিনটি পদক্ষেপের প্রসঙ্গে হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য 'হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে বলেন:


"ঋগ্বেদে বিষ্ণুর ত্রিপদবিক্ষেপের যে বর্ণনা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে তা থেকেই বামন অবতারের কাহিনীটির উদ্ভব। বামনপুরাণে বামন বলির নিকট অগ্নিরক্ষার তিন পাদ স্থান যাঞ্চা করেছিলেন। সূর্য ত অগ্নির প্রকারভেদ। সূর্যের তিন স্থানে বা তিনরূপে অবস্থান বামনরূপী বিষ্ণুর তিনপদ-বিক্ষেপের উৎস। বামনের বিরাট আকার মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপধারণের তুল্য। এই প্রসঙ্গে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে সহস্রশীর্ষা পুরুষের কথাও উল্লেখযোগ্য । সূর্যাগ্নির বিশ্বব্যাপকতা বামনের বিরাট রূপ গ্রহণের মূল তত্ত্ব। বিষ্ণুরূপী সূর্য বিশ্বপৃথিবী এবং মানবকুলের রক্ষার জন্যই ত্রিপদবিক্ষেপে জগৎ পরিক্রমণ করেন।"

(হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য ২০০৩: ২২৮-২২৯)


 ঋগ্বেদ সংহিতার প্রথম মণ্ডলে বলা হয়েছে, ভগবান বিষ্ণু লোক রক্ষার নিমিত্ত তিনটি মাত্র পদক্ষেপ দ্বারা পৃথিবী লোকসমূহ বিস্তীর্ণরূপে অতিক্রম করেছিলেন।


তত্তদিতদিদস্য পৌংস্যং 

গৃণীমসীনস্য ত্রাতুরবৃকস্য মীলহুষঃ ।

যঃ পার্থিবানি ত্রিভিরিদ্ বিগামভিরুরু 

ক্রমিষ্টোরুগায়ায় জীবসে ॥

(ঋগ্বেদ সংহিতা:১.১৫৫.৪)


"আমরা তাঁর সেই সেই বিশেষ পৌরুষ-শক্তির স্তুতি করি—সেই মহাশক্তিধর রক্ষাকর্তা যিনি শত্রুর বিনাশক এবং ফলদানকারী। তিনি লোক রক্ষার নিমিত্ত তিনটি মাত্র পদক্ষেপ দ্বারা পৃথিবী লোকসমূহ বিস্তীর্ণরূপে অতিক্রম করেছিলেন ।"


উপদ্রুত মানবকে সুরক্ষিত রাখতেই ভগবান বিষ্ণুর ত্রিপদক্ষেপ। বিষয়টি ঋগ্বেদ সংহিতার প্রথম মণ্ডলের মত ষষ্ঠ মণ্ডলেও বলা হয়েছে:


যো রজাংসি বিমমে পার্থিবানি 

ত্রিশ্চিদ্বিষ্ণমনবে বাধিতায়।

তস্য তে শর্মন্নুপদদ্যমানে

রায়া মদেম তন্বা তনা চ ৷৷

(ঋগ্বেদ সংহিতা:৬.৪৯.১৩)


"যিনি পীড়িত মানবের জন্য পার্থিব লোকসমূহকে তিনবার পরিমাপ করেছিলেন— হে বিষ্ণু, তোমার দ্বারা সেরূপ আশ্রয় প্রদত্ত হয়ে যেন আমরা সম্পদ এবং পুত্রগণসহ আনন্দ উপভোগ করতে পারি।"


ভগবান বিষ্ণুর দুটি পদক্ষেপ অবলোকন করা গেলেও, তৃতীয় পদক্ষেপ অচিন্ত্য; কেউ ধারণা করতে পারে না।


দ্বে ইদস্য ক্রমণে স্বৰ্দৃশো

ঽভিখ্যায় মর্ত্যো ভুরণ্যতি।

তৃতীয়মস্য নকিরা দধৰ্ষতি

বয়শ্চন পতয়ন্তঃ পতত্ৰিণঃ ॥

(ঋগ্বেদ সংহিতা:১.১৫৫.৫)


"বিষ্ণুর জ্যোতির্ময় রূপের দুটি মাত্র পদক্ষেপ অবলোকন করে, মর্ত্যের মানুষ বিস্ময়াবিষ্ট হয়৷ কিন্তু তাঁর তৃতীয় পদক্ষেপ কেউ ধারণা করতে পারে না, বায়ুলোকে ঊর্ধ্ব আকাশে উড্ডীয়মান পাখিরাও নয়।"


তথ্যনির্দেশ:

১.হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ (দ্বিতীয় খণ্ড), ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা: ২০০৩

লেখক পরিচিতি: 

শ্রী কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী 

সহকারী অধ্যাপক, 

সংস্কৃত বিভাগ, 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom