Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

বাংলা ভাষা রক্ষায় প্রাণ বলিদান: মৃত্যুঞ্জয়ী রাজেশ-তাপস

 


© শ্রী শান্তনু সিংহ

বীরের এ রক্তস্রোত , মাতার এ অশ্রুধারা

    এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা ।

    

মাত্র কয়েকদিন আগেই সর্বভারতীয় (!) তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড-ইন- কমান্ড বিরোধীদের মাথায় গুলি করে দেবার হুমকি দিয়েছিলেন। তার কথায় মান্যতা দিতেই হবে ।‌‌ সেদিন হয়তো উত্তেজনায় প্রকাশ্যে তিনি এ কথা বলে ফেলেছিলেন।  কিন্তু এই সুপ্ত বাসনা ওদের দীর্ঘদিনের । কারণ "গুলি"র সাথে ওদের ক্ষমতা রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 


তাই ধরে নেওয়া যেতেই পারে, সেদিন রাজেশ সরকার ও তাপস বর্মনের পেটে ও বুকে সরাসরি গুলি করবার পেছনেও ছিল ওদের ওই ক্ষমতার রাজনীতি। 


রাজ্য:  পশ্চিমবঙ্গ, জেলা : উত্তর দিনাজপুরের, থানা :  ইসলামপুর, গ্রাম : দাড়িভিট, পো : অফিস : দুলালিভিটা, বিদ্যালয় : দাড়িভিট হাই স্কুল। 


দাড়িভিট বা পাশের জনবসতি কোথাও উর্দুভাষী মুসলমান অধ্যুষিত ছিল না। দাড়িভিট হাই স্কুলে একটিও উর্দুভাষী মুসলমান ছাত্র বা ছাত্রী ছিল না। 


কিন্তু তাতে কি হল। 


তৃণমূল কংগ্রেস বা তাদের পরিচালিত সরকারের প্রয়োজন ছিল দল এবং সরকারের মুসলমান প্রীতি দেখানো। একটা সফট টার্গেট দরকার ছিল । খুঁজে পেতে বের করা হলো

দাড়িভিট হাই স্কুল। 


স্কুলের ১০০০ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে একটিও উর্দুভাষী মুসলমান ছাত্র বা ছাত্রী নেই। কিন্তু সেই সাথে স্কুলে নেই বাংলার শিক্ষক। কিন্তু সেই স্কুলেই নিয়োগ করা হলো একজন উর্ধ্ব শিক্ষককে। 


এই ঊর্ধশিক্ষক নিয়োগের প্রতিবাদে ছাত্রছাত্রীরা পথ অবরোধ করলে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে এসডিও স্বয়ং চলে আসেন । কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের বিক্ষোভ আন্দোলনে প্রশাসনের সুর নরম হয়। এসডিও নিজে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন, যেহেতু স্কুলে উর্দু শিক্ষকের প্রয়োজন নেই, তাই কোন উর্ধশিক্ষক স্কুলে নিয়োগ করা হবে না। 


১৮ ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ছাত্র-ছাত্রীরা জানতে পারে, এসডিও লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও উর্দু শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে । প্রধান শিক্ষক মহাশয় বলেন, এটা অনেক উঁচু মহল থেকে করা হয়েছে,  এসডিও র ও কিছু করার নেই। 


২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এসডিও লিখিত প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ১০০% বাঙালির স্কুলে উর্দু শিক্ষক নিয়োগের বিরুদ্ধে স্কুলের মধ্যেই প্রতিবাদ শুরু করে। কিন্তু কোন কারণ ছাড়াই পুলিশ অফিসার প্রণব মজুমদারের নেতৃত্বে প্রায় তিন ভ্যান পুলিশ স্কুলের মধ্যে প্রবেশ করে । আশ্চর্যের কথা, ওই সময় হঠাৎ স্কুলের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রণব মজুমদার এবং তার বাহিনী বাচ্চা বাচ্চা ছাত্র-ছাত্রীদের অস্রাব্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। পুলিশ হুমকি দিতে থাকে, "মুসলিম পাড়া দ্বারা ঘেরা এই স্কুলে কোনরকম উর্দু বিরোধী কথাবার্তা বরদাস্ত করা হবে না । না হলে মুসলমানদের আক্রমণ হবে ।" স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষক তথা তৃণমূল নেতা সাজ্জাদ ঘোষণা করে, "মুসলিম এলাকার মধ্যে টু শব্দ করলে খুন করে ফেলা হবে।" 


ছাত্রছাত্রীরা পুলিশ এবং তৃণমূলের এই হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই পুলিশ বিনা প্ররোচনায় হঠাৎ লাঠিচার্জ শুরু করে।  বাচ্চা বাচ্চা ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই লাঠির গায়ে লুটিয়ে পরে । ভয়ে ওরা স্কুলের দেওয়াল টপকে বাইরে আসার চেষ্টা করতে থাকে।‌ অনেকে ভয়ে শৌচালয়ে আশ্রয় নেয় । পুলিশ এখানে গিয়েও ছাত্র-ছাত্রীদের মেরে বের করতে থাকে। 


ছাত্র-ছাত্রীদের ভয় অর্থ চিৎকার ও কান্না এবং পুলিশের হুমকি ও গালাগালি শুনে অঞ্চলের মানুষ স্কুলের সামনে রাস্তায় জড়ো হয়। কিছুক্ষণ মধ্যে আরো তিন গাড়ি পুলিশ আসে। প্রত্যেক পুলিশের মুখই ছিল কালো কাপড়া ঢাকা। তারা এসেই আচমকা কাঁদানে গ্যাস এবং গুলি চালাতে শুরু করে । রাজেশ সরকার পেটে এবং তাপস বর্মন বুকে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে । গুলিতে বিপ্লব সরকারের বাঁ পা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। এরপরই পুলিশ ছয় ভ্যান ভর্তি পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত গতিতে পালিয়ে যায়। 


স্থানীয় মানুষরা রাজেশ ও বিপ্লবকে একটি পিকআপ ভ্যানে তুলে ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালের দিকে রওনা হন।  তাপসকে একটি মোটরসাইকেলে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার পথে অমল জারির কাছে গোলাপাড়া এলাকায় মুসলমানরা রাস্তা আটকে ওই পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। রাজেশের কাকার মাথা ফাটে, বিপ্লবের দাদাকে লাঠি ও পাথর দিয়ে আঘাত করা হয়। এমনকি রাজেশ ও তাপসের গুলিবিদ্ধ আঘাতে পাথর দিয়ে আবার আঘাত করা হয় । এই সমস্ত কিছু নেতৃত্ব দেয় সাজ্জাদ যার কথা আগেও বলা হয়েছে, ওই স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষক এবং অঞ্চলের তৃণমূল নেতা। রাস্তায় গাড়ি আটকে রেখে ওই জিহাদী মুসলমানরা তাপসের মৃত্যু সুনিশ্চিত করতে চায়। রাজেশকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পরই ডাক্তার থেকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে  মৃত্যু। তাপসকে ডাক্তাররা উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের রেফার করে দেন।‌ কিন্তু রাস্তায় তাপস মারা যায়। একই কারণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। 


কিন্তু পুলিশের অত্যাচার এখানেই শেষ হয়নি। এরপর প্রত্যেক রাতেই পুলিশের পোশাকে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা একদল অমানুষ বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে হুমকি, মহিলাদের নির্যাতন, পুরুষদের গ্রেপ্তার করতে থাকে। প্রায় ৭-৮ দিন অঞ্চলের সমস্ত পুরুষ মানুষ বাড়ি ছাড়া হয়ে যায়। প্রায় ৫০ জন গ্রামের মানুষের নামে মিথ্যে মামলা করা হয় । 


ওই ঘটনার সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুশ্রী মমতা ব্যানার্জি ইউরোপ সফর করছিলেন। তিনি সমস্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দাবি করেন, এটা আরএসএস বিজেপির পরিচালিত জঘন্য চক্রান্ত।  দুই সন্তানহারা মায়ের জন্য কোন ন্যায় বিচারের কথা তিনি বলেননি। দুই সন্তানহারা মায়ের বেদনার থেকেও দুই মা'কে সন্তানহারা করবার বিনিময়ে সংগঠিত মুসলমান ভোট ছিল তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


সরকার এবং তৃণমূল দলের ভূমিকায় পরিষ্কার করা যে, ওরা  চাইছিল মুসলমান ভোটকে একত্রিত করতে আর তার জন্য প্রয়োজন ছিল চরম হিন্দু বিদ্বেষ বা হিন্দু ক্ষতিকারক ভূমিকা কে মুসলমানের সামনে তুলে ধরা অন্যদিকে মুসলমানদের ধারক ও বাহক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করা। কারণ ভোট বড় বালাই । মুসলমান ভোট চাই। সংগঠিত মুসলমান ভোট। 


আর কম্যুনিস্টদের ভূমিকা! আরো নেক্কারজনক।


দু'জন‌ মায়ের কোল খালি করে দেওয়া সেই সমস্ত পুলিশ আধিকারিকদের আজ পর্যন্ত কোন বিচার হয়নি, বরং পদোন্নতি হয়েছে। 


বাংলার ছাত্র-ছাত্রী, বাংলার যুবসমাজ তাই আজ এগিয়ে আসুন। বাংলা সংস্কৃতি, বাংলার কৃষ্টি, বাংলার ভাষা এবং নিজেদের বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে রাজেশ-তাপসকে আজকের দিনে বিশেষভাবে স্মরণ করি। তাদের নত মস্তকে শ্রদ্ধা জানাই। তাদের সাহসকে কুর্নিশ করি, তাদের সাথেই শপথ নেই, পশ্চিমবাংলাকে উর্দু স্থান করতে দেব না। 


রাজেশ, তাপস, বিপ্লব; এরা প্রত্যেকেই ছিল অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদে সদস্য ও কর্মী। আজ ২০/০৯/২০২২ তারিখে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের তরফ থেকে পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িভিটের এই দুই বীর বাঙ্গালী স্বর্গীয় রাজেশ সরকার এবং স্বর্গীয় তাপস বর্মনকে আমরা শ্রদ্ধা জানাবো । সবাই এগিয়ে আসুন নত মস্তকে এই বীরদ্বয়কে শ্রদ্ধা জানাতে। 

লেখক পরিচিতি

শ্রী শান্তনু সিংহ এক পরিচিত নাম। সুবক্তা, জাতীয়তাবাদী, বহু বইয়ের লেখক এবং পেশায় কলকাতা হাইকোর্টের বরিষ্ঠ আইনজীবী।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom