Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

বেদের নাম মাহাত্ম্য



©  শ্রী সূর্য শেখর হালদার

বেদ যে সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ সে কথা আমরা সবাই জানি।  কিন্তু বেদ শব্দের অর্থ কি ? বেদের আর কি কি নাম আছে? এইগুলো সম্পর্কে আমাদের বেশির ভাগেরই ধারণা খুব কম। আসুন, আমরা আজ বিষয় গুলি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করি।


বেদ শব্দটি সংস্কৃত। বেদ শব্দের মধ্যেই নিহিত আছে বেদের অর্থ। বেদ শব্দটি এসেছে *বিদ ধাতু* থেকে। বিদ ধাতুর অর্থ চার প্রকার হয়ে থাকে - *জ্ঞান, বিচার, সত্তা ও লাভ।* সহজ ভাষায় বলতে গেলে যে গ্রন্থে সত্য বিষয়ক সর্বপ্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞান বিদ্যমান যে গ্রন্থ দ্বারা সব সত্যবিদ্যার জ্ঞান লাভ হয়, যে গ্রন্থে বিবিধ বিষয়ের বিচার বিবেচনা করা হয়, সেই গ্রন্থের নাম বেদ। যে গ্রন্থ ধর্ম - অধর্ম , কর্তব্য -কর্তব্য - এইসব বিষয়ের জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করে সেই গ্রন্থের নামই বেদ। 


বেদের আরো কয়েকটি নাম রয়েছে। এগুলি হল - *শ্রুতি, ত্রয়ী, নিগম ও ব্রহ্ম ( বাঙ্ময় ব্রহ্ম )* । আসুন , দেখা যাক প্রত্যেকটি নামের অর্থ কি? 

ইতিহাস বইতে লেখা থাকে বেদের আরেক নাম *শ্রুতি* কারণ বেদ কোন লিখিত গ্রন্থ নয়। সেই সুপ্রাচীনকালে গুরুর থেকে বেদ মন্ত্র শুনে শিষ্য মনে রাখত। বেদ মন্ত্র এভাবে স্মৃতিতে বেঁচে থাকত  গুরু শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে। শুনে শুনে বেদ অধ্যায়ন করতে হতো বলেই, বেদের আরেক নাম শ্রুতি। কিন্তু শ্রুতি শব্দের এই ব্যাখ্যা নেহাতই গৌণ ব্যাখ্যা। আসলে বেদের অপর নাম শ্রুতি হওয়ার মুখ্য কারণ হল বেদ অপৌরুষেয়: পরম ব্রহ্মের মুখনিঃসৃত বাণী। তপোনিষ্ঠ, যোগী ঋষি গণ তাঁদের বেদ বা জ্ঞান তাঁরা মন্ত্র রূপে দিব্যকর্নে  শ্রবণ করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন

 মন্ত্রদ্রষ্টা ; বেদের দিব্যবাণী তাঁরা ধ্যানের মাধ্যমে দর্শন করেছিলেন আর কানে শুনে যে দিব্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন , সেই লব্ধ জ্ঞান কেই বলা হয় শ্রুতি। আমাদের বিদ্যালয় পাঠ্য ইতিহাস বই এই অর্থটি উল্লেখ করে না , কারণ পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরা বেদকে একটি গ্রন্থ রূপে বিচার করে ; বেদ যে আপৌরুষেয় এই কথা তাঁরা মানেন না। আর কে না জানে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরি করা শিক্ষাবিদদের হাতে নিয়ন্ত্রিত !


বেদকে *ত্রয়ী* বলার কারণ হল বৈদিক মন্ত্র ক্রমানুসারে ঋক্ যজুঃ ও শাম - এই তিন ভাগে বিভক্ত। তবে আমরা জানি বেদ চার প্রকার-ঋক্  সাম  যজুঃ ও অথর্ব। মুণ্ডক কিংবা বৃহদারণ্যক উপনিষদ বেদ চার প্রকার বলেই উল্লেখ আছে। যেমন বৃহদারণ্যক উপনিষদ এ বলা হয়েছে - " " *"অস্য মহতো ভূতস্য নিশ্বসিতমেতদ্যদৃগ্বেদ যজুর্বেদ: সামবেদো অথর্বাঙ্গিরস:* " 

অর্থাৎ মহান পরমেশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি প্রকট হওয়ার সাথে সাথে ঋকবেদ্, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ নিঃশ্বাসের ন্যায় সহজেই বাইরে প্রকট হল। এর তাৎপর্য হলো বেদ পরমাত্মার নিঃশ্বাস। এতদসত্ত্বেও 

চতুর্বেদকে ত্রয়ী বলার কারণ ঋক্‌, সাম ও  যজুঃ - এই তিন প্রকার বেদ মন্ত্রে তিন প্রকার শৈলী প্রয়োগ হয়েছে - ঋক্‌বেদে পদ্য, সামবেদে গান আর যজুর্বেদে গদ্য। এই কারণেই বেদ কে ত্রয়ী বলা হয়।


বেদকে *নিগম* বলেও অভিহিত করা হয়। নিগম শব্দের অর্থ হলো নিশ্চিত রূপে গমন করানো। যে শাস্ত্রের অধ্যায়ন ও মনন সাধককে নিশ্চিত রূপে শ্রীভগবানের নিকট গমন করায়, সেই শাস্ত্রই হল নিগম বা বেদ। 


বেদের আরেক নাম *ব্রহ্ম।* বেদের বিচারে পরমাত্মা বা  পরব্রহ্মের সর্বোত্তম নাম হল *ওম্*। এই ওঙ্কার বা *প্রণব* হল ব্রহ্মের বাচক (বোধক/ অর্থ প্রকাশক ) এবং ব্রহ্মের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ। এই ওঙ্কার গঠিত হয়েছে চারটি বর্ণ নিয়ে। এগুলি হল-  *অ, উ, ম,  ৺* । এই চার বর্ণের মধ্যে '৺ ' ( চন্দ্রবিন্দু) কে বলা হয় অর্ধমাত্রা। এই চার বর্ণ ব্রহ্মের চতুষ্পাদকে নির্দেশ করে যথা *অ* - অব্যয় পুরুষ, *উ*- অক্ষর পুরুষ, *ম* - ক্ষর পুরুষ আর  *৺ (* আর্ধমাত্রা) - পরাৎপর পুরুষ। ঐতরেয় আরণ্যকের মতে *অ* কার হতেই সকল বর্ণের উৎপত্তি । শ্রীমৎ ভগবত গীতার দশম অধ্যায় ৩৩ তম শ্লোকে শ্রীভগবান বলেন :


 *অক্ষরাণামকারেহস্মি দ্বন্দ্বঃ সামাসিকস্য চ। 

অহমেবাক্ষয়ঃ কালো ধাতাহং বিশ্বতোমুখ:।। ৩৩/১০


অর্থাৎ,  সমস্ত অক্ষরের মধ্যে আমি *অ* কার, সমাসসমূহের মধ্যে আমি দ্বন্দ্ব-সমাস, সংহারকারীদের মধ্যে আমি মহাকাল রুদ্র এবং স্রষ্টাদের মধ্যে আমি ব্রহ্মা।


 *অ* বর্ণ যেহেতু অসঙ্গ তাই *অ* কারকে অব্যয় পুরুষ রূপে মান্য করা হয়। *উ* কার উচ্চারণ করবার সময় মুখ সংকুচিত হয়, তাই *উ* কারকে সঙ্গ ও অসঙ্গের  মিশ্রন বলা হয়। *উ* কার অক্ষর পুরুষ বাচক। আর *ম*  কার উচ্চারণে মুখ সবসময়ই সংকুচিত হয়। তাই *ম* কার হল ক্ষর পুরুষ বাচক  । অর্ধমাত্রা পরাৎপর ব্রহ্ম সূচক। এইজন্য প্রতিটি বেদ মন্ত্রের প্রারম্ভে ওঙ্কার উচ্চারিত হয়। ওঙ্কার হল বেদ রূপ ব্রহ্মের বাচক তাই বেদের আরেক নাম ব্রহ্ম। 


তথ্যসূত্র : অখন্ড বেদ -  জ্ঞান : যোগাচার্য শ্রীমৎ রামানন্দ সরস্বতী। গিরিজা লাইব্রেরী।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom