Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

মা দুর্গা: এক পরিপূর্ন রাষ্ট্র ভাবনা

 


 © শ্রী সূর্য শেখর হালদার


 " ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী /কমলা কমল দল বিহারিনী/  বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি  ত্বাং" 


 এভাবেই বন্দেমাতরম्  গানের মধ্যে দেবী দুর্গার  স্তব করেছেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র । 1870 খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করেন এই গান , আর 1882 খ্রিস্টাব্দে ‛আনন্দমঠ’ উপন্যাসে যুক্ত করেন এই সংগীতটিকে। এটি ভারতের জাতীয় স্তোত্র কারণ এটি হল দুর্গা মাতা রূপে রাষ্ট্রের বন্দনা যা সনাতন ভারতের ঐতিহ্য। এখানে আনন্দমঠের যে সন্ন্যাসীরা গানটি গেয়েছেন , তাঁদের কাছে মাতা হল দেশমাতা,  আর দেশমাতা হল দেবী দুর্গা স্বয়ং। 


 দেশমাতা রূপে দেবী দুর্গাকে পরিবেশন বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম করেননি।  আমরা রামায়ণে প্রথম ভগবান শ্রীরামকে বলতে শুনি: 

জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। অর্থাৎ স্বর্গের চেয়েও গরিমা যুক্ত হলেন দেশমাতা। এর অর্থ দেশমাতা ঈশ্বর সমতুল্য পূজনীয়। ভারতের ইতিহাস দেখলে আমরা দেখব বহিরাগত আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়  দেশমাতাকে দুর্গা রূপে কল্পনা করেছেন ভারতের বহু জনজাতি  বা  সম্রাট। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য রাজপুত এবং  মারাঠাদের বহিরাগত মোঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই। এই লড়াইতে তাঁরা অনুপ্রেরণা লাভ করতেন ‛জয় ভবানী’ ধ্বনি তুলে।  ভবানী দেবী দুর্গার আরেক নাম।  এর অর্থ এই যে দেশ মাতাকে রক্ষা করার জন্য যে যুদ্ধ,  সেখানে ভারতীয় সেনারা স্মরণ নিতেন দেবী দুর্গার। 


 ঊনবিংশ শতাব্দীতে দেশমাতাকে দুর্গা রূপে পূজা করাকে জনপ্রিয় করেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র।  পরবর্তীতে আমরা দেখি স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দেবী দুর্গার উপাসনা করছেন। এর কারণ হল সনাতন  ভারতের সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে মাতৃশক্তি বা দেবী দুর্গা রূপে কল্পনা করা । পরম বৈভব সম্পন্ন রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন বীরব্রত আর দেবী দুর্গার আরাধনা ব্যতীত এই বীরব্রত লাভ করা সম্ভব নয়। তাই বারবার দেবী দুর্গার মধ্যেই পরিপূর্ণ রাষ্ট্রভাবনাকে পরিলক্ষিত করেছে হিন্দু রাষ্ট্রের নাগরিক বা প্রজা। 


বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় রাস্ট্র মাতা দেবী দুর্গা হলেন দশপ্রহরণধারিণী,  অর্থাৎ দশ হাতে অস্ত্র ধারিণী: তিনিই দেবী লক্ষ্মী বা কমলা এবং তিনিই বাণী,  বিদ্যাদায়িনী অর্থাৎ দেবী সরস্বতী । অর্থাৎ দেশমাতা হলেন শক্তি, সম্পদ এবং জ্ঞানের উৎস। দেশ রক্ষা করতে যেমন শস্ত্রের প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন সম্পদ এবং শাস্ত্র জ্ঞানের। ‛আনন্দমঠ’উপন্যাসে আমরা দেখি ব্রহ্মচারী সত্যানন্দ ঠাকুর মহেন্দ্রকে দেবী দুর্গার তিনটি রূপ দর্শন করান।  এই তিনটি রূপ ভারতবর্ষের রূপ।  এইরূপ গুলি হল - ' মা যাহা ছিলেন,  মা যাহা হইয়াছেন, মা যাহা হইবেন। ' অর্থাৎ দেশমাতৃকার অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। এই তিনটি রূপ হল যথাক্রমে মা জগদ্ধাত্রী , মা কালী এবং মা দুর্গা । অতীতে জন্মভূমি দেশমাতৃকা ছিলেন সাহিত্য-সংস্কৃতি শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ।  তাই অতীতের ভারতমাতা দেবী জগদ্ধাত্রী।  বর্তমানে অর্থাৎ ঋষি বঙ্কিমের সময়ে ( উনিশ শতক ) দেশমাতা  পরাধীন,  নগ্নিকা, রুধিরসিক্তা,  কঙ্কালমালিনী মা কালী। আর ভবিষ্যতে তিনি হতে যাচ্ছেন দশ হাতে অস্ত্র সমন্বিত দশপ্রহরণধারিণী দুর্গা। এভাবেই রাষ্ট্রের অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যত এর বর্ণনা দিতে গিয়ে দেবী দুর্গার তিনটি রূপের সাহায্য নেন ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র ।


আবার দেবী দুর্গা সত্ত্বগুণের প্রতীক,  আর তাঁর বাহন হল বনের রাজা সিংহ।  পুরাণ অনুযায়ী এই সিংহ দেবীকে প্রদান করেন হিমালয়।  সিংহ রজ: গুণের প্রতীক।  দেশ পরিচালনার জন্য সত্ত্ব এবং রজ: গুণের সমন্বয়ের প্রয়োজন অবশ্য।  তাই আমরা দেখি 1937 খ্রিস্টাব্দে পি.এস. রামচন্দ্র রাও ভারত মাতার যে ছবি অঙ্কন করেন,  সেখানে দেশমাতা দেবী দুর্গার ন্যায় সিংহবাহিনী। এই সিংহবাহিনী রাস্ট্র মাতার  প্রতিমা সত্ব ও  রজ: গুণের  সমন্বয়ের প্রতীক। এর আগে 1905 খ্রিস্টাব্দে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত ভারতমাতার ছবি ছিল জাতীয়তাবাদীদের কাছে অনুপ্রেরণা দায়ক।  অবনীন্দ্রনাথ অবশ্য রাস্ট্র মাতাকে বৈষ্ণবী রূপ  দিয়েছিলেন । তাঁর হাতে ছিল অন্ন,  বস্ত্র , রুদ্রাক্ষ যা জ্ঞানের প্রতীক এবং বরাভয় । রাষ্ট্র মাতা আমাদের অন্ন, বস্ত্র, জ্ঞান দিয়ে প্রতিপালন করেন ঠিক যেমন ঈশ্বরী করে থাকেন। এটিও মাতৃ শক্তির একটি রূপ। তবে মাতৃ শক্তি সন্তানকে  সুরক্ষাও দান করেন। এই সুরক্ষার  দিকটি আরো প্রাণময় হয়ে ওঠে পি. এস. রামচন্দ্র রাওয়ের সিংহ বাহিনী ভারতমাতার ছবিতে। আজও প্রতি বছর 26 জানুয়ারি সিংহ বাহিনী ভারতমাতার প্রতিমা দেশজুড়ে পূজিত হয়। 


বঙ্কিম চন্দ্রের ‛আনন্দমঠ’ ছাড়াও ঋষি অরবিন্দের ‛সাবিত্রী’ কাব্যগ্রন্থতে আমরা দেশমাতা রূপে দেবী দুর্গার কল্পনার অস্তিত্ব পেয়ে থাকি। ‛সাবিত্রী’ কাব্যগ্রন্থের সাবিত্রী হলেন দেশমাতা দেবী দুর্গা।  পন্ডিচেরিতে যে বিগ্রহের সম্মুখে ঋষি অরবিন্দ ধ্যানমগ্ন হতেন,  সেটাও ছিল অখন্ড ভারতের মানচিত্র আর ভারত মাতার চিত্রপট । 1901 খ্রিস্টাব্দে বেলুড়মঠে শক্তি পূজা আরম্ভ করেন স্বামী বিবেকানন্দ।  তিনিও তাঁর ‛প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’প্রবন্ধে জাতির উন্নতির জন্য আদ্যা শক্তি রূপে দেশমাতাকে পূজার কথা বলেছিলেন।  তাই তাঁর  দুর্গাপূজা যে আসলে ভারত মাতার পূজা - এই কথা সর্বজন স্বীকৃত। 


বর্তমানে আমরা যে দুর্গা প্রতিমার আরাধনা করি, সেই দুর্গা প্রতিমার সঙ্গে থাকেন দেবী সরস্বতী,  দেবী লক্ষ্মী, দেবসেনাপতি কার্তিক এবং শ্রী শ্রী গণপতি।  প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এনারা হলেন দেবী দুর্গার সন্তানাদি। তবে এইরূপ ধারণা নেহাতই লৌকিক ধারণা । কিন্তু লৌকিক ধারণা হলেও এই উপাসনার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার উপাসনাকে আমরা এক পরিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার বন্দনাতে পরিণত করেছি। দেবী সরস্বতী বিদ্যা, জ্ঞান ও শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রতীক: দেবী  লক্ষী সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রতীক :  দেবসেনাপতি কার্তিক প্রতিরক্ষা বা সুরক্ষার এবং শ্রী শ্রী গণপতি সমবায়ের প্রতীক।  এখন রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার জন্য শিক্ষা-সংস্কৃতি,  সম্পদ,  প্রতিরক্ষা এবং সমবায় চারটি বিষয়েরই প্রয়োজন।  প্রাচীনকালে ভারতীয় সমাজে ছিল চারটি বর্ণ যা শরীরের চার অঙ্গের মতো অপরিহার্য।  বর্ণপ্রথা মানে উচ্চ - নীচ বিচার নয় । এইরূপ ধারণা মেকলে শিক্ষা ব্যবস্থার আবিষ্কার। বৈদিক সমাজে চার বর্ন  ছিল একে অপরের পরিপূরক।  রাষ্ট্রমাতা দেবী দুর্গাও ঠিক তেমনই এই চার বর্ণের উপর নির্ভরশীল।  তাই দেবী সরস্বতী,  দেবী লক্ষী , শ্রী শ্রী কার্তিক,  ও শ্রী শ্রী গণেশ ছাড়া দেবী দুর্গার পূজা সম্ভব নয় । আমরা ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখব এই চারজন দেব - দেবী  চার বর্ণের প্রতীক।  জ্ঞান বিদ্যার দেবী সরস্বতী প্রথম বর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ গুণের প্রতীক:  শ্রী শ্রী কার্তিক হলেন ক্ষত্রিয় গুণের প্রতীক:  সম্পদের দেবী লক্ষী হলেন বৈশ্য গুণের প্রতীক আর শ্রী শ্রী গণপতি হলেন শুদ্র গুনের প্রতীক।  ব্রাহ্মণের মস্তিষ্ক,  ক্ষত্রিয়ের শক্তি , বৈশ্যের সম্পদ আর শুদ্রের শ্রম একত্রিত হলে, তবেই কিন্তু রাষ্ট্র মাতা বৈভব সম্পন্ন হতে পারে।  সেই দিক থেকে দেখতে গেলে দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবার একত্রে হয়ে ওঠেন সম্পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক। রাষ্ট্রের কাজ হল দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। মহিষাসুর রুপী দুষ্টের দমন করে দশপ্রহরণধারিণী রাষ্ট্রমাতা সেটাই করে চলেছেন। 


আবার দূর্গা সম্পর্কে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বলা হয়েছে দেবী 'নিঃশেষ দেবগন শক্তিসমূহ মূর্ত্যা'  । তাঁর দশ হাতের অস্ত্র দেবতাদের সম্মিলিত শস্ত্র । দেশমাতা বা  ভারত মাতার শক্তিও ঠিক তেমনই নাগরিকদের সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ। রাষ্ট্র যেমন  সমসংস্কৃতি ও সমভাবাপন্ন মানুষদের সম্মিলিত শক্তি,  ঠিক তেমন দেবীদুর্গা হলেন  সংগঠিত দেবগনের সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ।  তাই যথার্থই দেবী দুর্গা হলেন রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপূর্ণ রূপ ।  দেবী দুর্গার আরাধনার অর্থ রাষ্ট্রেরই আরাধনা : আর দেবী দুর্গার প্রতিমা ভাঙার অর্থ হল রাষ্ট্রকে আক্রমণ : দেবী দুর্গাকে অপমান হল দেশদ্রোহীতার পাপকে স্পর্শ করা। হিন্দু রাষ্ট্রের ভাবনাতে এভাবেই একাকার হয়ে যায় দেশ , ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতা। 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom