Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

চপ, ঘুগনিই ভবিষ্যৎ



© দীপ্তাস্য যশ

সম্প্রতি মমতা ব্যানার্জীর রোজগারের জন্য চা, ঘুগনী, ঝালমুড়ি, চপ বেচার নিদানটি সমাজের শিক্ষিত অংশে বেশ খানিক হাসির খোরাক জুগিয়েছে, কিন্তু সমাজের এই শিক্ষিত অংশ বুঝছেনা গত দশ বছরে শিক্ষায় দুর্নীতির জেরে যে সামাজিক অসাম্য মমতা ব্যানার্জী সৃষ্টি করেছেন তাতে সমাজের একটি অংশের ভবিষ্যতই এখন চা, ঘুগনী, চপ, ঝালমুড়ি বেচা। এছাড়া অন্য কোন প্রকারে রোজগারের উপায়ই আর তাদের হাতে নেই। তাদের সামনে এখন দুটোই পথ। এক হয় চা, ঘুগনি বেচো আর নাহলে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে দক্ষিন্, উত্তর বা পশ্চিম ভারত বা উড়িষ্যায় গিয়ে রাজমিস্ত্রীর লেবার খাটা, আর যদি ঘরে থেকে সম্মানের সাথে রোজগার করতে হয় তাহলে ডেলিভারী বয় হও। এর বাইরে তাদের আর কোন ভবিষ্যতই নেই।


মমতা ব্যানার্জীর শিল্পের ধারণাটি বরাবরই একটু গোলমেলে, এখন তার সাথে যোগ হয়েছে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। যে আত্মবিশ্বাসেই ভর করে তিনি ভুয়ো নিয়োগপত্র তুলে দেন একটি কাজের খোঁজে পাগল হয়ে যাওয়া তরুণ তরুণীদের হাতে। যদি তিনি সত্যিই আমাদের রাজ্যের লাখ লাখ যুবক যুবতী যারা গ্র্যাজুয়েশান করে সিন্ডিকেটের মেম্বার না হয়ে একটি সম্মানজনক কাজের খোঁজে পাগলের মতো দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পাড়ি দেন তাদের সাথে এরকম তঞ্চকতা না করে শিল্প, জীবিকা ইত্যাদি নিয়ে একটু গভীরেই ভাবতেন, তাহলে এমন তঞ্চকতা করার কোন প্রয়োজনই তার হতোনা।


শিল্পোন্নত হওয়ার প্রথম পদক্ষেপই হোল রাজ্যে ভারী শিল্প স্থাপন। একজন চা বিক্রেতা হয় তো দিনে হাজার টাকার চাও বিক্রি করতে পারেন কিন্তু তিনি হাজার জনকে জীবিকার যোগান দিতে পারবেননা। তিনি বড়জোর নিজের জীবিকা অর্জন করতে পারবেন। তিনি তখনই নিজের জীবিকা অর্জন করতে পারবেন যখন বাজারে তার প্রোডাক্টের চাহিদা থাকবে। যদি আজ সবাই চা বিক্রেতা হয়ে যায় তাহলে বাজারে চাহিদা কিভাবে তৈরি হবে?


নিশ্চিত ভাবেই চায়ের দোকান, চপের দোকান অনেকের জীবিকার মাধ্যম, অনেক সংসারও চলে সেই রোজগারের উপরে নির্ভর করে। কিন্তু তাদের রোজগারের পুরোটাই নির্ভরশীল ক্রেতার উপরে। ক্রেতা যদি না থাকে বা ক্রেতার হাতে যদি টাকা না থাকে তাহলে চাহিদা কোথায় থাকবে?

অর্থনীতির এই চাহিদার ক্ষেত্রেই একটি বড় ভূমিকা নেয় ভারী শিল্প। একটি ভারী শিল্পের স্থাপনা মানে তার অনুসারী আরও বেশ কিছু শিল্পের স্থাপনা। সেই সব শিল্পে বেশ কিছু সেমি-স্কিল্ড এবং আনস্কিলড লেবারের কর্মসংস্থান। শিল্পের মাধ্যমে জীবিকা এবং কর্মসংস্থানের এটাই সূত্র। অবশ্যই এখানে ভারী শিল্প বলতে ঘুগনির ভারী হাঁড়ি বোঝানো হচ্ছেনা। ভারী শিল্প বলতে গাড়ি, ইস্পাত, সার, কেমিক্যাল এসবকেই বোঝানো হচ্ছে। গত দশ বছরে মমতা ব্যানার্জী এই শিল্পের জন্য কতোটা উদ্যোগী হয়েছেন?


কয়েকটা ছোট্ট হিসাবে চোখ বুলিয়ে নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

২০২০-২১ সালে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টারে পশ্চিমবঙ্গের গ্রস স্টেট ভ্যালু ১৪০৯৬৫০৯ (লাখে)। অপরদিকে উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্য যা এই কদিন আগেও পিছিয়ে পরা রাজ্য বলে গণ্য হতো তাদের গ্রস স্টেট ভ্যালু ১৮০৪৪৪১৯ (লাখে)। ইন্ডিয়া ইনভেস্টমেন্ট গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবাংলায় মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫১,১২৮ কোটি টাকা। নতুন প্রজেক্ট মাত্র ৬৯ টি। এর মধ্যে ৩৩ টি পরিবহন ক্ষেত্রে। এগুলি সবই কেন্দ্রীয় প্রকল্প। যেমন জোকা বিবাদী বাগ মেট্রো, পাণাগড় দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ইত্যাদি। এই সব প্রকল্পগুলিতে রাজ্যের যোগদান শূন্য। যোগদান মানে শুধুই বিনিয়োগের কথা বলছিনা, বিনিয়োগ আকর্ষণের কথাও বলছি। অপরদিকে উত্তরপ্রদেশে যেহেতু রাজ্য সরকার নিজে বিনিয়োগ করছে ফলে সেখানে প্রকল্প রূপায়নের গতিও অনেক দ্রুত। 


এনার্জী সেক্টারে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ মাত্র ৬.৯৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এর মধ্যেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ মাত্র ১.৯৬ বিলিয়ান ইউএস ডলার। অর্থাৎ বাকী যা সেসবই পুরনো প্রকল্পের রক্ষণা বেক্ষন।

রিয়াল এস্টেটের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ মাত্র ২.৪৯ বিলিয়ান ইউএস ডলার। 


সব থেকে খারাপ অবস্থা ম্যানুফ্যাকচারিং অর্থাৎ উৎপাদন শিল্পে। বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৪৪.৩৯ মিলিয়ান ইউএস ডলার। 


এবার একটু অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করা যাক। তুলনা করতে গিয়ে বারেবারে উত্তর প্রদেশের কথা এই কারনেই টানছি কারন আমাদের রাজ্যের শাসক দলের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান, তারা “বাংলাকে উত্তর প্রদেশ হতে দেবেনন”। উত্তর প্রদেশে একই সময়ে নতুন প্রজেক্ট শুরু হয়েছে ৩০৩টি।


গত বছর ভারতে রেকর্ড পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ অর্থাৎ ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট হয়েছে। ২০২০-২১ সালে ভারতবর্ষে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৮১.৭২ বিলিয়ান ইউএস ডলার। এর মধ্যে গুজরাটে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ, মহারাষ্ট্রে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৭ শতাংশ, কর্ণাটকে প্রায় ১৩ শতাংশ। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৩৯.৩৬ মিলিয়ান ইউএস ডলার। 


গুজরাট তো অনেক দূরের ব্যাপার। এমনকি বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান গোটা দেশের মধ্যে এগারো নাম্বারে। উত্তর প্রদেশ, উত্তরা খন্ডের মতো রাজ্যগুলি তো বটেই, আমাদের পাশের রাজ্য ঝাড়খন্ডও আমাদের থেকে এগিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সার্ভের মোতাবেক।


মমতা ব্যানার্জী মনে করেন শিল্প বিষয়টা কাশফুল ছিঁড়ে বালিশ বানিয়ে নেওয়ার মতোই সোজা। কিন্তু আদতে তা নয়। শিল্পের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা একটা দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। তা রাতারাতিও হয়না, আর ভেতরে ভেতরেও হয়না। তা হলে প্রকাশ্যেই হয়। কারন এর জন্য অন্যতম যে দুটি বিষয় তা ভেতরে ভেতরে করা যায়না। এক – পরিকাঠামো। এই ক্ষেত্রে রাস্তা, রেল, বন্দর এগুলি ভেতরে ভেতরে হওয়া সম্ভব নয়। গত পনেরো বছর শুধুমাত্র রাজ্য সরকারের অনীহার কারনে জমি অধিগ্রহন না হওয়ার ফলে কোলকাতা থেকে শিলিগুড়ি জাতীয় সড়কের সম্প্রাসারন সম্ভব হয়নি। 


শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোল, দক্ষ এবং অদক্ষ শ্রমিকের যোগান। সেখানে যে কি অবস্থা তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী জাল নিয়োগপত্র বিলি করছেন এবং তারপরেও এখনও কোন অধিকারিক সাসপেন্ড হননি বা কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। তারপরেও কিছু তথ্য তুলে ধরছি আপনাদের সামনে।


স্কিলড এবং সেমি স্কিলড শ্রমিক তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আইটিআই গুলি। মমতা ব্যানার্জীর কাছে যদিও আইআইটি আর আইটিআই একই ব্যাপার, তাই তিনি অবলীলায় বলে দিতে পারেন তাঁর আমলে রাজ্যে পাঁচশো আইআইটি স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু আদত চিত্র একটু তথ্য ঘাঁটলেই উঠে আসে। 


পশ্চিমবঙ্গে পাঁচশো আইআইটি তো অনেক দূরের ব্যাপার পাঁচশো আইটিআইও নেই। এই রাজ্যে আইটিআই-এর বর্তমান সংখ্যা ২৬৮টি। এই আইটিআইগুলিতে ৮২টি ট্রেডের কোর্স করানো হয়। ২০১৯ সালের হিসাবে মোট আসন সংখ্যা ৯৫,২৯২টি। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ আসনই ভর্তি হয়। ২০১৮ সালে আসন সংখ্যা ছিল ৮৮,৪৫৮ টি।

এই তুলনায় উত্তর প্রদেশে ৩১৮৮টি আইটিআই প্রায় ৯৪টি ট্রেডের কোর্স করানো হয়। ২০১৯ সালের হিসাবে আসনের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ একষট্টি হাজার নয়শো চারটি। তফাতটা পরিষ্কার এবং কারনটাও পরিষ্কার।


মমতা ব্যানার্জী আসলে খুব ভালো করেই জানেন “ভেতরে ভেতরে” শিল্প, শিক্ষা সবই তিনি শেষ করে ফেলেছেন। তিনি জানেন এই রাজ্যের যুবসমাজকে দেওয়ার মতো কোন ভদ্রস্থ কর্মসংস্থান তাঁর কাছে নেই। দিতে হলে ভুয়ো বিনিয়োগই দিতে হবে। কারন এখানে শিল্প নেই। আর গুজরাট বা কর্ণাটকে যে কল কারখানা আছে সেই রাজ্যগুলি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক তৈরি করার পরিকাঠামো অনেক আগেই তৈরি করেছে।কাজেই তারা সেই পরিকাঠামো ব্যবহার করেই প্র্য়োজনীয় শ্রমিকের চাহিদা পূরণ করতে পারবে। তাদের দায় নেই মমতা ব্যানার্জীকে ঢাকের যোগান দেওয়ার। 


এসবই মমতা ব্যানার্জী জানেন তাই তিনি পরিষ্কার জানিয়েই দিচ্ছেন কর্মসংস্থান এই রাজ্যে কিছুই নেই। যদি সিন্ডিকেটে ঢুকতে পারো তাহলে রোজ রাতের মদ মাংসটুকুর যোগান আমার ভাই ভাইপোরা করে দেবে। আর তা করতে যদি তোমার মানে বাঁধে তাহলে তুমি যাও চপ, মুড়ি যা পারো বেচে নিজের পেট চালাও, আমার কোন দায় নেই তোমার পেট চালানোর। শিক্ষাকেও শেষ করেছেন, এর ফলে কয়েক বছর পরে এমন একটা প্রজন্ম তৈরি হবে যাদের ডেলিভারী বয় হওয়ার মতো নূন্যতম যোগ্যতাটুকুও হবেনা। ফলে ঐ চপ, চা, ঝালমুড়ি, ফুচকা, ঘুগনি এসবই আপাতত বাঙালির ভবিষ্যৎ।

(মতামত ব্যক্তিগত)

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom