Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

স্বামীজির শিকাগো আগমণ


© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

বস্টনের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের উদ্যোগে শিকাগো ধর্ম মহাসভা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিচয় পত্র পান স্বামীজি। 1893 খ্রিস্টাব্দে 9 সেপ্টেম্বর সন্ধ্যাবেলায় স্বামীজির শিকাগোতে এসে পৌঁছান। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এর আগে যখন স্বামীজি  শিকাগোতে পদার্পণ করেন,  তখন তাঁর প্রয়োজনীয় পরিচয় পত্র ছিল না এবং  কম খরচে থাকার জন্য বস্টন চলে যান। পরে বস্টনে মিস ক্যাথরিন স্যানবর্ন এর  সূত্রে অধ্যাপক রাইট এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর  এবং অধ্যাপক রাইট স্বামীজীর জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পরিচয় পত্র তৈরি করে দেন। 

যাইহোক এবারেও শিকাগো পৌঁছে স্বামীজি আরেক বিপত্তির সম্মুখীন হলেন। তিনি দেখলেন যে ধর্ম মহাসভার অফিসের ঠিকানা লেখা কাগজটা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। কাউকে জিজ্ঞাসা করেও অফিসের কোনো সন্ধান পেলেন না। তখন ক্লান্ত অবসন্ন সন্ন্যাসী শিকাগো স্টেশনের একটি মালগাড়ির ফাঁকা কামড়ায় আশ্রয় নিলেন। প্রবল শীত এবং ক্ষুধা সহ্য করে তিনি মালগাড়ির মধ্যে রাত কাটালেন। সকালে তিনি চেষ্টা করলেন ভিক্ষা করে কিছু আহার্য সংগ্রহের। কিন্তু আমেরিকা আর ভারত এক নয়। আমেরিকায় ভিক্ষাজীবি সন্ন্যাসীকে কেউ ভিক্ষা দেয়না। অতঃপর কেউ মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল,  কেউবা বন্দুক দেখিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করল। কিছুক্ষন চেষ্টার পর স্বামীজি রাস্তার ধারে অবসন্ন অবস্থায় বসে পড়লেন এবং সিদ্ধান্ত করলেন ঈশ্বরের নির্দেশে যখন তিনি দেশ ছেড়ে এখানে এসেছেন তখন ঈশ্বরই তাঁকে রক্ষা করবেন। 

যে কোন মহৎ কাজ মানুষের নিরন্তর চেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু দৈবিক আশীর্বাদ ছাড়া কোন মহৎ কাজই আবার সফল হয় না। শ্রীরাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন, কিন্তু তবুও রাবণ বধের জন্য তাঁকে দৈবিক সাহায্য লাভ করতে হয়েছিল। শ্রী হনুমান, জাম্ববান, মহারাজ সুগ্রীব ও বিভীষণের সাহায্য:  রাবণের সঙ্গে অন্তিম যুদ্ধের পূর্বে মাতলী চালিত ইন্দ্রের রথ না থাকলে শ্রীরামের পক্ষে রাবণ বধ সম্ভব হত কি? রামায়ণ পাঠ করলে আমরা দেখব এই সবই ছিল দৈবিক সাহায্য।

স্বামীজীও ঠিক সেইরকম প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দৈবিক সাহায্য লাভ করলেন। এই ক্ষেত্রে দৈবিক অনুকম্পা রূপে আবির্ভূত হলেন মিসেস জর্জ ডব্লিউ হেল। যে রাস্তায় স্বামীজি বসে ছিলেন ঠিক তার উল্টো দিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। রাজরানী সদৃশ এই ভদ্র মহিলা স্বামীজীকে দেখে জানতে চাইলেন যে তিনি ধর্ম মহাসভায় যোগ দিতে এসেছেন কিনা। স্বামীজি সদর্থক উত্তর দিতেই ভদ্রমহিলা সসম্মানে স্বামীজীকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ধর্ম মহাসভার আধিকারিকদের সঙ্গে মিসেস হেলের  যোগাযোগ ছিল । তাই বিকেলেই স্বামীজিকে নিয়ে তিনি গেলেন ধর্ম মহাসভার অফিসে। সেখানে রাইট সাহেবের দেওয়া পরিচয় পত্র দেখাতেই স্বামীজি ধর্ম মহাসভায় প্রতিনিধি হিসেবে গৃহীত হলেন। 

এভাবেই দেখা যায় শিকাগোতে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ব জয় করার পথে একাধিক বার দৈবিক সাহায্য পেয়েছিলেন স্বামীজি। তাঁর শিকাগো যাত্রাও ছিল ঈশ্বরের নির্দেশ। তাঁর সৎ প্রচেষ্টা তো ছিলই , কিন্তু যখনই অজানা অচেনা পরিবেশে একাকী সন্ন্যাসী কোন বিপদে পড়েছেন, তখনই তিনি অলৌকিকভাবে পরিত্রাণ পেয়েছেন। আর সাহায্য করেছেন কিছু  আমেরিকাবাসীই। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষেদের থেকে হঠাৎ পাওয়া এই  সাহায্যকে দৈবিক সাহায্য ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?

ধর্ম মহাসভায় প্রতিনিধি হবার পর উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে স্বামীজীকে মিস্টার লায়নের বাড়িতে থাকতে দেওয়া হল। মিস্টার লায়ন দেখলেন ধর্ম মহাসভা যে প্রতিনিধিকে তাঁর বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছে,  তিনি শ্বেতাঙ্গ নন।  তখন তিনি ভাবলেন যে স্বামীজীকে বাড়িতে না রেখে হোটেলে রাখবেন। কারণ সেই সময় তাঁর বাড়িতে কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ অতিথি ছিলেন। কিন্তু স্বামীজীর সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা এবং তাঁর সঙ্গে দু'একটি কথা বলে মিস্টার লায়ন এতটাই মুগ্ধ হলেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন তাদের অন্য অতিথিরা স্বামীজীর আগমনে বিরক্ত হলেও তিনি স্বামীজীকে বাড়িতেই রাখবেন। স্বামীজীর মতন এত আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এবং প্রতিভাধর মানুষ আগে কোনদিন তাঁদের বাড়িতে আসেননি। তাই স্বামীজীর যতদিন ইচ্ছা হয় তিনি মিস্টার লায়নের বাড়িতে থাকবেন। 

এভাবেই ধর্ম মহাসভায় বক্তৃতা রাখার প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন হল স্বামীজীর। ধর্ম মহাসভা শুরুর দিন ছিল 1893 খ্রিস্টাব্দে 11 সেপ্টেম্বর। সেদিন যা ঘটেছিল , সেটা ঐতিহাসিক। তবে তার আগে যেসব বাধা  স্বামীজি জয় করে এগিয়ে গিয়েছিলেন সেগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। ইংরেজি তে একটা কথা আছে : *God help those who help themselves*।  বিশ্বের সমক্ষে দেশকে তুলে ধরার স্বামীজীর যে আন্তরিক ও নিরলস প্রচেষ্টা, সেটা ঈশ্বর ও প্রত্যক্ষ করেছিলেন । তাই দৈব আশীর্বাদ ছিল স্বামীজীর সহায়। 11 সেপ্টেম্বর সেই ঐতিহাসিক ক্ষণে দেবী সরস্বতীকে স্মরণ করে যে বক্তৃতা স্বামীজি করেছিলেন, তাতেই চমকিত হয়েছিল সারা বিশ্ব। এ যেন বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটকে মার্ক অ্যান্টনির বক্তব্য ( Antony's Oracle)।

 জুলিয়াস সীজারকে হত্যা করার পর জুলিয়াস সীজারের অন্তিম যাত্রায় স্বল্প কিছু বলার অনুমোদন লাভ করেছিলেন সীজারের বিশ্বস্ত সেনাপতি মার্ক অ্যান্টনি। চতুর্দিকে শত্রু ঘেরা পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে সীজার অনুগত অ্যান্টনি যা বলেছিলেন তাতে সারা রোম কেঁপে গিয়েছিল। এতক্ষণ সীজারকে শত্রু ভাবা রোমবাসী অ্যান্টনির বক্তব্য শুনে পরিণত হয়েছিল সীজারের সমব্যথীতে এবং সমর্থন জানিয়েছিল সীজার অনুগত অ্যান্টনিকে : সীজার হত্যাকারী ক্যাসিয়াস বা ব্রুটাসকে নয়। স্বামীজীর শিকাগো ধর্মসভা থেকে উদ্বোধনী ভাষণও ঠিক এইরকমই ছিল। বিদেশের মাটিতে, সম্পূর্ন অ-হিন্দু পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্বামীজি যা বলেছিলেন তাতে আমেরিকার ক্রিশ্চান শ্রোতারাই ধন্য ধন্য করেছিলেন স্বামীজির আর আমাদের সনাতন ধর্মের। 



তথ্য সূত্র : পরিব্রাজক স্বামীজী : দেশে ও বিদেশে। রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার,  গোলপার্ক,  কলকাতা। 


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom