Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

ভাইফোঁটা: বিশ্ব ভাতৃত্ববোধের উৎস চিহ্ন

Representative Image

© শ্রী অসিত চক্রবর্তী

ভারতবর্ষ বিশ্বকে অনেক কিছুই দিয়েছে। বিশ্বকে দেওয়া ভারতের শ্রেষ্ঠ অবদানের মধ্যে পরিবার ব্যবস্থা অন্যতম। ভারতের পারিবারিক ব্যবস্থায় পরিবারিক বন্ধন সুদৃঢ়। যা দেখে বিশ্বের মানুষ আশ্চর্য হয়ে যায়। এই অভেদ্য, স্থায়ী ও সুদৃঢ় পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে কিছু আচার -অনুষ্ঠান। যা এই বন্ধনকে সুদৃঢ়তা দান করে। সাবিত্রী ব্রত, শীতল ষষ্ঠীর ব্রত যেমন যথাক্রমে স্বামী কিংবা সন্তানদের মঙ্গল কামনায় স্ত্রীলোকরা করে থাকেন তেমনই ভাইদের মঙ্গল কামনায় বোনেরা করেন ভাই ফোঁটা অনুষ্ঠান। এরজন্য বৎসরের নির্ধারিত দিনটি হল দীপাবলির কালীপূজার পরের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিটি। এই দিনটিই ভাতৃদ্বিতীয়া বলে প্রসিদ্ধ।  

       ‌পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, মহারাষ্ট্র, বাংলাদেশ  নেপাল ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশ বিদেশে পালিত হয় ভাইফোঁটা। দক্ষিণ ভারতে এই উৎসবটিকে বলে যম দ্বিতীয়া। উত্তর ভারতে এই উৎসবই ভাইদুজ নামে পরিচিত। মহারাষ্ট্রে এই অনুষ্ঠান টি ভাইদুজ বা ভাববীজ নামে পালিত হয়। নেপালে এই উৎসবটি ভাইটিকা বলে প্রচলিত। আমাদের  বাংলাভাষীদের কাছে এটি ভাইফোঁটা এবং সাধুভাষায় এটিরই নামাকরন হল ভাতৃদ্বিতীয়া। নামতো বিভিন্ন,  কিন্তু হৃদয়ের বীনার সুর একটিই - ভাইবোনের পারস্পরিক স্নেহ ভালবাসার স্পন্দন।

       ‌ ভাইফোঁটা দুইদিন ব্যাপী। আগের দিন শুক্ল প্রতিপদে এর শুভারম্ভ। সেদিন  ভাইকে ফোঁটা দিতে গিয়ে বোন বলবে -

    প্রতিপদে দিয়া ফোঁটা রাখলাম নিয়ম, 

    দ্বিতীয়াতে দিয়া ফোটা করাইব ভোজন।

পরদিন মূল অনুষ্ঠান। সে অনুষ্ঠানকে সুন্দর করে তোলার জন্য কদিন আগে থেকেই বোনের প্রস্তুতিপর্ব  শুরু হয়। নিজের হাতেই মুড়ি, নারকেল, চিড়া ইত্যাদির নাড়ু বানানো, সন্দেশসহ ইত্যাদি মিষ্টির জিনিষ বানানো, কত কি। ভাতৃদ্বিতীয়ার দিন বোন ঠাকুরঘরে ঈশ্বরের কাছে ভাইয়ের মঙ্গলকামনা করে।  

       এই অনুষ্ঠান একেবারেই সরল। এতে যাগযজ্ঞ পূজা আবশ্যিক নয়। তাই পুরোহিতেরও দরকার নেই। এটি সম্পূর্ণ ঘরোয়া বা পারিবারিক অনুষ্ঠান। যেকোন ধর্মাচারনের মানুষ এই অনুষ্ঠান করতে পারেন। এটি একটি ভারতীয় আচার। এই আচার শিক্ষায় বড় হয়ে উঠা নরেন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে চিকাগোর বিশ্ব ধর্মসভায় সেদিন বিশ্ববাসীকে "ব্রাদার্স এন্ড সিস্টার্স " বলে সম্বোধন করতে পেরেছিলেন। তারপর অজস্র করতালিতে প্রশংসিত, গোটা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেবার ঘটনা, সবার জানা। যা  ভারতের ভাই- বোনের মধুর সম্পর্কের ভাবনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বৈকি। সে অনুষ্ঠান দেখতে পরিবারের সবাই এমনকি পাড়া-পড়শিরা এসে জড়ো হন। মেয়েদের মাঙ্গলিক উলুধ্বনির মধ্যেই বোন ভাইয়ের কপালে ঘি, চন্দন বা কাজলের ফোঁটা এঁকে দেন।  ফোঁটা দিতে গিয়ে বোন একটি মন্ত্র আওড়াতে থাকেন। যা পুরোটাই একটা বাংলা ছড়া। সংস্কৃত শ্লোকের কঠিন ঝক্কি ঝামেলা এতে নেই। বোন বলতে থাকে-

     ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা,

    যম দুয়ারে পড়ল কাঁটা ।

    আজ থেকে ভাই আমার, 

যম দুয়ারে নিম তিতা । 

    যমুনা দেয় যমরে ফোঁটা,

আমরা দেই ভাইরে ফোঁটা 

    স্বর্গে হুলুস্থুল মর্তে জোকার 

আজ থেকে ভাই আমার, না যাইয়ো দূর। 

       স্থান বা অঞ্চল অনুসারে মন্ত্রটির মধ্যে পার্থক্য ধরা পড়ে। কিন্তু মূল বিষয় বা সুর একই। সবটিতেই বোনেরা ভাইয়ের নিরাপদ, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন কামনা করেন। তা ছাড়াও ধান-দুর্বা দিয়ে অর্ঘ্য দেওয়া, প্রদীপের বাতির পবিত্র আলোয় ভাইয়ের আবাহন বা আরত্রীক করা হয়।

      ভাইবোন শব্দটিতে নিহিত শব্দ দুটি ভাই ও বোন। যে শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথে আপনজনের পবিত্র উপস্থিতি মনে উৎসারিত হয়। হৃদয় পুলকিত হয়। চেতনার এই ভাবরস সমৃদ্ধতাই ভারতীয় সংস্কৃতির পরিবারতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। যা পরিবার ও সমাজ জীবন আনন্দময় করে তোলে । পারিবারিক সম্পর্কের দৃঢ়ীকরণ হয়।  

          ভাইফোঁটা অনুষ্ঠান আগে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিটি বাড়িতে পালাক্রমে উদযাপিত হত। পাড়ার সব ভায়েরা এক এক বাড়িতে এক এক সময়ে  পালাক্রমে আমন্ত্রিত হতেন।সারিবদ্ধ ভাবে সবাইকে বসিয়ে, সে বাড়ির বোন এক এক করে মন্ত্র পড়ে ফোঁটা দিতেন। পাড়ায় সবাই একে অপরের ধর্মের ভাইবোন বলে বিবেচিত হতেন। সে সম্পর্কের স্থায়িত্ব ও আন্তরিকতার টান জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকত। এটা ছিল আমাদের এক সময়ের  পরম্পরা। সমাজকে শক্তিশালী করার এ এক প্রেরণাস্তম্ভ। বলা হয়,"জন্মের চেয়ে ধর্মের লয়" বড় বা অনেক বেশি কার্যকরী। যা বোনদের জীবনের সুরক্ষার অনেকটাই নিশ্চয়তা প্রদান করে। উপরন্তু সামাজিক বন্ধনকে প্রসারিত ও সুদৃঢ় করে। তা ছাড়াও এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্নেহ,  ভালবাসা, প্রীতি ও ঐক্য ইত্যাদি মানবিক গুণগুলি ক্রিয়ান্বিত হয় ও পরিপুষ্ঠতা লাভ করে । 

          আজ কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথির সাথে জড়িয়ে আছে আরেকটি পৌরাণিক কাহিনী। নরকাসুর বধ করে দ্বারকার উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন শ্রীকৃষ্ণে। হস্তিনাপুরের পাশ দিয়েই যাচ্ছিলেন। তার মনে পরে গেল বোন সুভদ্রার কথা।  নিজেই তো উদ্যোগ নিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন অর্জুনের সাথে। কেমন আছে বোন ? যেই ভাবা সেই কাজ। সোজা চলে গেলেন বোন সুভদ্রার রাজপ্রাসাদে। বহু দিন পর ভাইকে দেখে সুভদ্রার আনন্দ আর ধরেনা। সমাদর করে ভাইকে ঘরে এনে বসালেন।  ক্লান্ত শ্রীকৃষ্ণকে যত্ন করে এনে দিলেন মূল্যবান খাবার। তারপর কপালে একে দিলেন অমঙ্গল বিনাশকারী ফোঁটা। নিজের হাতে মুখে তুলে দিলেন খাবার। সেদিনও ছিল কার্তিকের শুক্লা দ্বিতীয়া। সমাজের বরণ্য লোকেদের কাছ থেকেই এভাবে দেশে প্রচলিত হল ভাইফোঁটা।সংসারে ভাই বোনেদের মধুর সম্পর্ক এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে  এক ঘরোয়া উৎসবের রূপ নিল। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সমাজ থেকে এভাবেই ভাতৃত্ববোধ, বিশ্বভাতৃত্ববোধ ইত্যাদি চেতনা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে।

       ভাইফোঁটা অনুষ্ঠান একেবারে ঘরোয়া অনুষ্ঠান হলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে কিছু পৌরাণিক কাহিনী। একটি কাহিনী হল যম ও যমুনাকে নিয়ে। সূর্যদেবতার তেজ ও ক্ষমতা দেখে মোহিত হয়ে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন সংজ্ঞা। সংজ্ঞা হলেন  বিশ্বকর্মার মেয়ে। বিবাহের কিছুদিন যেতে না যেতেই সংজ্ঞা বুঝলেন এত তেজসম্পন্ন সূর্যদেবের সাথে তার ঘর করা সম্ভব নয়। স্বামীর তেজে তার শরীরে ঝলসে যাওয়ার উপক্রম।  কিছুতেই যেন এই প্রচন্ড উত্তাপের সাথে নিজের অভিযোজন হয়ে উঠছেনা।  এক সময়ে সূর্যদেবের ঔরসে তার যমজ সন্তান ভূমিষ্ঠ হল। নাম রাখা হল যম ও যমুনা। অসহনীয় তেজ থেকে মুক্তি পেতে নিজের অনুরূপ প্রতিমূর্তি ছায়া তৈরী করে যম যমুনাকে তার হাতে সমঝে দিলেন। নির্দেশ দিলেন নিজ সন্তানের মত স্নেহ ভালবাসা দিয়ে ছায়া যেন তাদের প্রতিপালন করে। ছায়ার প্রতিশ্রুতি পেয়ে তিনি সূর্যদেবের ঘর পরিত্যাগ করে চলে গেলেন। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছায়া তাদেরকে নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ দিয়ে। বড় করে তুলছিলেন। দিন বহে যায়।  ধীরে ধীরে ছায়ার মনে পরিবর্তন এল। সে ক্রমশঃ বিমাতার রূপ পরিগ্রহ করল। যম যমুনার উপর দিনের পর দিন অত্যাচার বেড়েই চললো। অবশেষে ছায়ার নিজের সন্তানের জন্ম হল। এবারে সে যম যমুনার বিরুদ্ধে স্বামীকে নালিশ জানাতে লাগল। তাতে অতিষ্ঠ হয়ে সূর্যদেব যম যমুনাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলেন। 

       সময় স্থির হয়ে বসে থাকেনা। এক সময় যম মৃত্যুর দেবতারূপে নিযুক্ত হল। আর বিতারিত যমুনা ক্ষোভে দুঃখে মর্তে চলে এল এবং নদী রূপ নিয়ে বইতে থাকল। দিন যায়, যমের খুব মনে পড়ছিল বোনেকে। অনেক দিন ধরে দেখা নেই তাদের। শেষে একদিন যম বোনকে দেখতে চলে এল পৃথিবীতে। সোজা এসে হাজির যমুনার ঘরে। হঠাৎ ভাইকে দেখে যমুনা আনন্দে আত্মহারা। সেদিন ছিল কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া। দেওয়ালীর দুদিন পর। দীপাবলির জন্য তার ঘরদোর ছিল সাজানো গোছানো। এই উৎসব মুখর পরিবেশে ভাইকে পেয়ে আনন্দিত যমুনা তাকে যত্ন করে পিঁড়িতে বসিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে, জোকার দিয়ে কপালে পড়িয়ে দিল চন্দন , দই এবং ঘি এর টিপ। আর পরমেশ্বরের কাছে ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় জানালো প্রার্থনা। অনেকে বলেন, এর থেকেই পৃথিবীতে প্রচলিত হল ভাইফোঁটা ।

লেখক পরিচিতি

শ্রী অসিত চক্রবর্তী

কুটুম্ব প্রবোধন প্রমুখ

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ

দক্ষিণ আসাম প্রান্ত ।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom