Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

রাহুল গান্ধীর পদযাত্রায় কংগ্রেসের ভাগ্য ফেরানো কি সম্ভব হবে!



© শ্রী রঞ্জন কুমার দে

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ সময় দিয়ে পার করছে। মোদির হিন্দুত্ব কার্ডে ২০১৪-এর পর থেকেই ক্রমশঃবিপর্যস্ত হতে হতে কংগ্রেস এখন মাত্র দুইটি রাজ্যে মিটমিট করে জ্বলছে। উপরন্তু দলের প্রতি আস্থা হারিয়ে তাবড় তাবড় কংগ্রেসি সিনিয়র নেতাদের দল ছাড়ার হিড়িক লেগে আছে, ধর্মনিরেপক্ষ আঞ্চলিক দলগুলোও এমনভাবে ঘুটি সাজিয়ে রেখেছে যে কংগ্রেস কোনভাবেই বিজেপির বিকল্প হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারছে না। এমনকি সেইসব রাজ্যে যেমন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম সহ গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চল, ইউপি , বিহার প্রভৃতিতে কংগ্রেস নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখা দুস্কর হয়ে উঠেছে। ধারাবাহিক লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভায় ধরাশয়ী হয়ে তর্জনী কংগ্রেস নেতৃত্ব তথা গান্ধী পরিবারমুখী, এমন অবস্থায় যুবরাজ রাহুল গান্ধী ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই দলের অধ্যক্ষ পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে আর দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। একাধিক যোজনা, ফর্মুলা যখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে ঠিক তখনই দলকে পুরো দেশজুড়ে চাঙ্গা করতে রাহুল গান্ধী দায়িত্ব কাঁদে নিয়ে সবচেয়ে পুরানো অভিনব পন্থা পদযাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি সেই পদযাত্রার নাম দিয়েছেন , "ভারত জোড়ো যাত্রা(Bharat Jodo Yatra)"। সেখানে বিভিন্ন রকম স্লোগান স্থান পেয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে "নফরত ছোড়ো, ভারত জোড়ো", "কদম মিলে বতন জুড়ে" প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত ১৫০ দিনের এই পদযাত্রা প্রায় দীর্ঘ ৩৫৭০ কি.মি বিস্তীর্ণ থাকবে, তবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে বিবেচনা করে কৌশলগতভাবে  কংগ্রেস তাঁদের এই যাত্রা গুজরাটে এবং হিমাচলে প্রবেশ করাবে না।রাহুল গান্ধীর এই পদযাত্রা সাংগঠনিকভাবে সাফল্য কিংবা আসন্ন নির্বাচনে ভোটবাক্স ফুলেফেঁপে উঠবে কিনা তা সময়েই বলবে তবে অতীতে এইরূপ রাজনৈতিক গণজাগরণ চেষ্টা  টনিক হিসাবে কাজ করেছে। লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রা বা চন্দ্রবাবু নাইডু এবং জগণ মোহন রেড্ডির পদযাত্রায় যথেষ্ট সাফল্যে পাওয়া গিয়েছিলো, যদিও চন্দ্র শেখর আজাদ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে এইরূপ এক পদযাত্রার আয়োজন করলেও রাজনৈতিকভাবে তেমন সাফল্য আসেনি  এবং সেরকম লোকও জোটাতে পারেননি। যাই হোক, রাহুল গান্ধীর এই ভারত জোড়ো আন্দোলনের আরেকটি মূখ্য উদ্দেশ্যে হলো দলের মৃতপ্রায় সংগঠন শক্তিকে চাঙ্গা করে তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মধ্যে প্রাণচঞ্চলতা ফিরিয়ে আনা।

       রাহুল গান্ধীর এই ভারত জোড়ো যাত্রাকে বিরোধী এবং মিত্র শিবিরও যে যার মতো করে মন্তব্য করছে। প্রাক্তন কংগ্রেসি তথা আসামের হিন্দু ফায়ার ব্র্যান্ড মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলেন - কংগ্রেসের উচিত ভারত জোড়ো যাত্রা পাকিস্তান থেকে শুরু করা; কারণ কংগ্রেসের কারণেই দেশভাগ হয়েছে। কেরলে পিনরই বিজয়ন নেতৃত্বাধীন সিপিএম রাহুল গান্ধীর এই পদযাত্রাকে মোটেও ভালোচক্ষে নেয়নি, তবে দক্ষিনের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন রাহুল গান্ধীর এই যাত্রাকে সবুজ পতাকা দেখিয়ে তাকে নিজের ভাই বলে সম্বোধন করেন। রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসের অভিযোগ গেরুয়া শিবির মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার অপপ্রয়োগ করে রাহুলকে অপরিপক্ক, হাস্যরসাত্মক, কার্টুনরূপে পরিবেশন করছে এবং তাহারা যথেষ্ট এই ক্ষেত্রে সাফল্যও পাচ্ছে। রাহুলকে নাকি সংসদে কথা বলারও পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, তাই রাহুল গান্ধী এই পদযাত্রাকেই জনগণের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসাবে মনে করছেন। তাঁর এই পদযাত্রায় রাহুল গান্ধী  কখনো বৃষ্টিতে ভিজে ভাষণ দিচ্ছেন, কখনো মা সোনিয়া গান্ধীর পায়ের জুতোর ফিতে বেঁধে দিচ্ছেন বা হিজাব পরিহিতা কোন মেয়েকে বুকে টেনে আনছেন। এই সময়ে সাংবাদিকদের ছোঁড়া বিভিন্ন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিচ্ছেন, কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব সহজেই মিশে যাচ্ছেন। একটা জিনিস খুব লক্ষণীয় রাহুল গান্ধী উনার ভারত জোড়ো যাত্রায় আক্রমণের তীর বারংবার বিজেপি ও আরএসএসের দিকে, কিন্তু অন্য কোনও রাজনৈতিক দল নিয়ে টুঁ শব্দটিও নেই।

        রাহুল গান্ধী হয়তো কংগ্রেসকেই বিজেপির প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী  ভাবছেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। বিশেষত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় সবাই নিজেদের ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্ধী ভেবে নিজেদের করে গুটি সাজাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জি বিজেপির বিজয়রথ একাই আটকে দিয়ে বিজেপির অন্যতম বিকল্পের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, কংগ্রেসের তাবড় তাবড় সিনিয়র নেতাদের যোগদান করিয়েছেন তৃণমূলে। প্রথমে বেশ কয়েকবার অন্যান্য বিরোধী দলদের সাথে বিভিন্ন রাজ্যে সৌজন্যে সাক্ষাৎকারে মমতার তৃতীয় ফ্রন্টের জল্পনা অনেকটা তুঙ্গে ছিলো, কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর আর কোন তৃতীয়জোটে আস্থা নেই। বরং একাই আগামী লোকসভা নির্বাচন লড়তে চান, এবং কাকতলীয়ভাবে হলেও তিনি এখন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং আরএসএসের প্রতি তুলনামূলকভাবে অনেকটা নমনীয়। এদিকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালও পাঞ্জাব বিজয়ে জাতীয় রাজনৈতিক সমীকরণের নতুন মাত্রা জুড়ে দিয়েছেন, আসন্ন হিমাচল এবং গুজরাট নির্বাচনে আপ পার্টি পাখির চোখ করে রেখে আছে। কেজরিওয়াল গুজরাট সফরে মোদি শাহকেই বারংবার টার্গেটে রাখছেন এবং সফ্ট হিন্দুত্বের কার্ডে তিনি নিজেকে এখন কৃষ্ণের বংশজ দাবি করছেন। তাই আপ যদি এই দুটি রাজ্যে সামান্যতম চমক পাঞ্জাবের মতো নিয়ে আসতে পারে তাহলে স্বভাবতই  ২০২৪-এর জাতীয় নির্বাচনে কেজরিওয়াল বিরোধীদের অন্যতম প্রধানমুখ হয়ে উঠে আসবেন। তেলেঙ্গানা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কেসিআর প্রধানমন্ত্রীত্বের মোহে নিজের পার্টি তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির নামকরণ করেছেন ভারত রাষ্ট্র সমিতি।এনসিপির শারদ যাদব কিংবা শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরেও নিজেদের পছন্দের প্রধানমন্ত্রীর জন্য গোটবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন, শুন্য আসনের মায়াবতীও মহাদলিত ভোটের দোহাইয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীত্বের দাবিদারী করছেন।বিহার ইউপিকে বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীত্বের পাটিগণিত অসমাপ্ত,আর সেখান থেকে সুশাসক নীতিশ বাবু বিজেপি ত্যাগ করে দিল্লিতে তৃতীয় মোর্চার চরম কুচকাওয়াজ শুরু করে দিয়েছেন।আরজেডির তেজস্বী প্রসাদ যাদব চাচা নীতিশ কুমারকে দিল্লিতে পাঠিয়ে পাটনাতে চুটিয়ে রাজপাট পরিচালনা করার বাসনা অনেক আগেই সার্বজনীন করে রেখেছেন। উত্তর প্রদেশের সপা কার্যালয়ে সম্মুখে বড় বড় হেডিংয়ে ঝুলছে লেখা,"ইউপি + বিহার = গেলো মোদি সরকার", অর্থাৎ নীতীশ কুমারে অখিলেশদের কোন আপত্তি নেই। 

প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক দলগুলির বিপক্ষ জোট ঘোর মোদি বিরোধিতায় রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস শিবিরকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আদৌ কি তাহা সম্ভব! মমতা ব্যানার্জির পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে মাত্র ৪২ টি লোকসভা আসন, যেখানে গত নির্বাচনে বিজেপির অনুকূলে ১৮টি আসন চলে গিয়েছিলো। নীতিশ কুমারের বিহারে রয়েছে মোট ৪০টি লোকসভা আসন, ইউপিতে রয়েছে সর্বোচ্চ ৮০টি লোকসভা আসন, শারদ পাওয়ারের মহারাষ্ট্রে রয়েছে সর্বমোট  ৪৮ টি লোকসভা আসন, কেসিআরের তেলেঙ্গানায় রয়েছে ১৭ টি লোকসভা আসন। এই সবগুলো আসন যদি একসঙ্গে জড়ো করা যায়, তথাপিও আঞ্চলিক দলগুলো ম্যাজিক ফিগার ২৭২ তে পৌঁছতে পারছে না। মমতা ব্যানার্জি, তেজস্বী, অখিলেশদের নিজের রাজ্যের বাইরে একটাও লোকসভা আসন নেই বা তাঁদের সেখানে তেমন কোন গ্রহণযোগ্যতাও নেই। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের পটভূমি নিঃসন্দেহে ২০১৯ নির্বাচন  থেকে অনেকটা ভিন্ন মেরুতে। ২০১৯শে তে অবশ্যই মোদি আমেজে নীতিশ কুমার , উদ্ধব ঠাকরেরা বিজেপির সঙ্গে মিত্র জোটে অতিরিক্ত আসন জিততে পেরেছিলেন, কিন্তু এইবার তাঁহাদের ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল কোন দিকে মোড় নেয় সেটা সময়ই বলবে! মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্দে গোষ্ঠীর সাথে বিজেপির রাজনৈতিক সমীকরণ যদি আগামী লোকসভা নির্বাচনে সাফল্য নিয়ে আসতে পারে তাহলে উদ্ধোবের শিব সেনার অস্তিত্ব হয়তো মিটে যেতে পারে। গত লোকসভায় উত্তরপ্রদেশে সপা,বসপা, আরএলডির যৌথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিজেপি আসন সংখ্যা বাড়িয়ে  ৮০ তে ৬২  স্কোর করতে পেরেছিলো,এমনবস্তায় সপার গড় আজমগড় ,রামপুরে উপনির্বাচনে পর্যুদস্ত হয়ে মুলায়মবিহীন সপা হিন্দুত্ববাদী ফায়ার ব্র্যান্ড যোগীকে কতটুকু চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে! গেরুয়া শিবিরের কপালেও ভাঁজ পড়েছে কারণ এবার এনডিএর অন্যতম পুরাতন জোটসঙ্গী শিবসেনা, জেডিউ,শিরোমণি অকালি দলবিহীন তাঁহারা ভোটের ময়দানে লড়তে যাচ্ছে।তাই খোদ অমিত শাহ উত্তরপ্রদেশ,বিহার, পশ্চিমবঙ্গ,তেলেঙ্গানা, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, ছত্তিশগড়ের ১৪৪ টি লোকসভা আসনে পাখির চোখ রেখে রণনীতি নিজের হাতে সাজাচ্ছেন। আগামী আসন্ন হিমাচল,গুজরাট,তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনে দেশের জনগণের মোড যথেষ্ট ফুঁটে উঠবে।প্রধানমন্ত্রী মোদির কংগ্রেসমুক্ত নাড়া আজকের দিনে যথেষ্ট সামঞ্জস্য, আঞ্চলিক বিরোধীদলগুলিও একই উপসর্গে ভুগছে।কংগ্রেসবিহীন বিরোধী জোট কোনভাবেই খাপ খাচ্ছে না ,আর কোন দলও মিত্রগোষ্ঠীর জন্য একইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়।এমনবস্তায় রাহুলগান্ধির ভারতজুড়ো যাত্রা সঞ্জীবনী হয়ে বিরোধী শিবিরের ভোট ভাগাভাগিতে ছেদ ধরাতে না পারলে ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচন আবার বিজেপির জন্য কেল্লাফতে।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom