Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

দীপাবলী

 



© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

দীপাবলী সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতির এক অন্যতম এবং আকর্ষণীয় উৎসব। বসন্তকালে পালিত হোলি উৎসব এর মতই এই উৎসব সারা বিশ্বে পালিত হয় এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কাছেও জনপ্রিয়। হিন্দু, জৈন , শিখ এবং কিছু কিছু বৌদ্ধ সম্প্রদায় এর মানুষ দীপাবলি পালন করে থাকেন। হিন্দু ক্যালেন্ডারের কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষে এই দীপাবলী উৎসব পালন হয়। ধনতেরাস অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী থেকে আরম্ভ করে পাঁচ দিন ধরে এই উৎসব চলে। এই উৎসবের সঙ্গে শ্রীরাম ও সীতা, লক্ষীদেবী, ধন্বন্তরি ( আয়ুর্বেদ চিকিৎসার দেবতা), যম ও যমী,  বিশ্বকর্মা, মহাকালী, কুবের এর নাম ও কীর্তি জড়িয়ে আছে। 

পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ প্রভৃতি বিভিন্ন পুরাণে দীপাবলী উৎসবের কথা পাওয়া যায়। বিভিন্ন সংস্কৃত সাহিত্যতেও ( শাস্ত্র ছাড়া সেক্যুলার সাহিত্য)  দীপাবলী উৎসব এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হর্ষ  রচিত সংস্কৃত নাটক ‛নাগনন্দা’, রাজ শেখর রচিত ‛কাব্যমীমাংসা’। এছাড়াও ভারতে আগত বিভিন্ন বিদেশী পর্যটক যেমন অলবিরুনি, নিকোলাস ডি কন্তে, ডমিঙ্গো পাস ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পালিত হওয়া দীপাবলী উৎসব এর বর্ণনা দিয়েছেন।

দীপাবলীর পূর্বে সনাতন ধর্মে (হিন্দু, জৈন, শিখ, বৌদ্ধ সহ)  বিশ্বাসী মানুষ তাদের গৃহ পরিষ্কার এবং রং করেন। দীপাবলীর শুরুর দিন অর্থাৎ ধনতেরাসের দিন ধন্বন্তরির আবির্ভাব দিবস হিসেবে পালিত হয়। সমুদ্র মন্থনে ধন্বন্তরির উত্থান ঘটে। তাঁর হাতে থাকে আয়ুর্বেদের গ্রন্থ আর অমৃত কলস যা আয়ুর্বেদিক প্রয়োজনীয় বনৌষধি পূর্ণ। এই দিন লক্ষ্মী দেবীরও আবির্ভাব দিবস বলে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী সংস্কারি মানুষ মনে করেন এবং সেই কারণে সম্পদ বা মূল্যবান ধাতু ক্রয় করে থাকেন। এই দিন ধন্বন্তরির পূজা হয়ে থাকে। লক্ষ্মী পূজাও হয়। রাত্রে বাড়ির অভ্যন্তর এবং বাহির অংশ মাটির দিয়া প্রজ্জ্বলন করে আলোকিত করা হয়। তুলসী তলায় প্রদীপ দিয়ে অকাল মৃত্যু প্রতিরোধের কামনা করা হয় মৃত্যু দেবতা যমের কাছে। দীপাবলীর দ্বিতীয় দিনেও মহালক্ষ্মীর পূজা হয়ে থাকে। এই দিন পূর্ব ভারতের বিভিন্ন স্থানে মহা কালীর পূজাও হয়।

দীপাবলী আলোর উৎসব। দিয়া প্রজ্জ্বলন ও আতশবাজি প্রদর্শনের  সময়। অনেকে মনে করেন এই দীপাবলির সময় শ্রীরামচন্দ্র সীতামাতা আর ভাই লক্ষণ সহ বনবাস শেষ করে অযোধ্যা ফিরে আসেন। রাবণ বধ করে,  বনবাস শেষ করে লোকপ্রিয় রাজার রাজ্যে প্রত্যাগমনের কারনে আনন্দে মাতোয়ারা হন অযোধ্যা বাসী। এটিও দীপাবলী উৎসবের অন্যতম এক উপলক্ষ। 

দীপাবলীর দ্বিতীয় দিন হল চতুর্দশী। এই চতুর্দশী ভূতচতুর্দশী নামে পরিচিত। এমনিতেই পবিত্র  কার্তিক মাসে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে আলো দান করা আমাদের সংস্কার। মনে করা হয় ভূত চতুর্দশীর দিন পূর্বপুরুষরা মর্তলোকে নেমে আসেন আর তাঁদের সম্মান জানিয়েই তাঁদের উদ্দেশ্যে আলো দেখানো হয়। এই দিন চোদ্দ শাক খাওয়া ও সন্ধ্যায় চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম আছে। হেমন্তের শুরুতে চোদ্দ শাক আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এই চোদ্দ প্রকার শাক হল - জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, ওল, পুঁই, বেতো, সর্ষে, কালকাসুন্দে, নিম, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা ও শুষণী। সনাতন সংস্কার বলে মানুষের মৃত্যুর পর মানুষের দেহ পঞ্চ ভূতে ( ক্ষিতি ,অপ, তেজ, মরুৎ ,ব্যোম) বিলীন হয়ে যায়। এই পঞ্চভুত নিয়েই তৈরি প্রকৃতি। সেই প্রকৃতি থেকেই চোদ্দ শাক সংগ্রহ করা হয়। চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানোর বৈজ্ঞানিক কারণ হল - হেমন্তের শুরুতে আগত পোকা দূর করা। এভাবেই দেখা যায় সনাতন সংস্কার বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই চলে। 

ভূত চতুর্দশী নরক চতুর্দশী নামেও পরিচিত। কথিত আছে এই দিন শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে সঙ্গে নিয়ে নরকাসুর বধ করেন। নরকাসুর প্রথম জীবনে বড় ভক্ত ছিলেন। পরে তিনি অত্যাচারী হয়ে পড়েন। সে কারণেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বধ করেন, কিন্তু তাঁর পূর্বজীবনের ভক্তির কথা স্মরণ করে, তাঁর নামে এই দিনটি উৎসর্গ করা হয়। 

চতুর্দশীর পরের দিন প্রতিপদ ( পরবর্তী শুক্লপক্ষের প্রথম দিন)। এই প্রতিপদ বলি প্রতিপদ নামে পরিচিত। বলি ছিলেন অসুরদের রাজা। তাঁর অহংকার চূর্ণ করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বামন অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেন। বামন এই দিনে বলি রাজার দানের অহংকারকে চূর্ণ করেন। এই ঘটনা স্মরণ করে এই দিন শ্রীকৃষ্ণকে পূজা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, দোষ থাকলেও তিনি ছিলেন ভগবানের পরম ভক্ত। তাই তিনি যখন পাতালে পতিত হন তখন ভগবান স্বয়ং তাঁর দ্বাররক্ষী হিসেবে সেই পাতালে অবস্থান করতে থাকেন। তাই বলি রাজার নামেই এই প্রতিপদের নামকরণ করা হয়েছে। 

দীপাবলী উৎসব এর একটি অন্যতম পর্ব হল ভাই ফোঁটা বা ভাইদুজ। ভাই-বোনের পবিত্র সম্পর্ককে স্মরণ করে এই উৎসব পালন করা হয়। বোনেরা মৃত্যু দেবতা যমের কাছে ভাইয়ের আয়ু কামনা করেন। ভাইরা বোনদের উপহার, আশীর্বাদ দিয়ে থাকেন, বোন বয়সে বড় হলে তাঁকে প্রণাম জানান। কথিত আছে এই দিন যমের বোন যমী তাঁকে ভাইফোঁটা দেন। সেই ঘটনা স্মরণ করেই এই প্রথা আজও চালু আছে।

দীপাবলী উৎসবের অঙ্গ হিসাবে গোবর্ধন পূজাও পালিত হয় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। গোবর্ধন পূজা হল পরমব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণের পূজা। শ্রীকৃষ্ণ যখন মনুষ্য দেহ ধারণ করে অবতার রূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন, তখন তিনি বিভিন্ন লীলা করেন। ইন্দ্রের রোষ থেকে গ্রামবাসীদের বাঁচানোর জন্য এবং দেবরাজ ইন্দ্রের অহংকারকে চূর্ণ করার জন্য, তিনি এক লীলা করেন।  ইন্দ্র প্রদত্ত প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ( ঝড় ও বৃষ্টি) থেকে বৃন্দাবন বাসীদের বাঁচানোর জন্য বালক শ্রীকৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বতকে তাঁর আঙ্গুল দিয়ে তুলে ধরেন।  ঝড় বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত গৃহহারা মানুষ এই পর্বতের তলায় আশ্রয় নেন। ইন্দ্র তাঁর ভুল বুঝতে পেরে শ্রীকৃষ্ণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করে গোবর্ধন পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

বজ্রযান বৌদ্ধ সম্প্রদায় দীপাবলীর সময় মহালক্ষ্মীর পূজা করেন। জৈন সম্প্রদায়ের মানুষ দীপাবলীকে মহাবীরের মহানির্বাণ ( দেহত্যাগ) দিবস হিসেবে পালন করে থাকেন। আর শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ দীপাবলী পালন করেন গুরু হরগোবিন্দ এর মুক্তি দিবস হিসাবে। উল্লেখ্য এই দিন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এর গোয়ালিয়র দুর্গ থেকে গুরু হরগোবিন্দ মুক্তি পান।

দীপাবলী আজকের দিনে সারা পৃথিবী জুড়ে পরিচিত এক উৎসব। ভিন্নধর্মী মানুষরাও দীপাবলী উৎসবে সামিল হন। ইংল্যান্ড, আমেরিকা,  অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের সর্বোচ্চ কর্তারাও দীপাবলী উপলক্ষে বার্তা দেন। ভারত আর নেপাল পৃথিবীতে দুটি হিন্দু প্রধান দেশ আছে। এই দুই দেশ ছাড়াও মরিশাস, মালয়েশিয়া, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, ফিজি ইত্যাদি দেশে সাড়ম্বরে পালিত হয় এবং এই দিনটি ছুটির দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। দীপাবলী আলোর উৎসব। মনের সমস্ত অন্ধকার কাটিয়ে স্বর্গীয় অনুভূতির আলোতে মন ও জীবনকে আলোকিত করার এক সময়। যতদিন মানবসভ্যতা পৃথিবীতে থাকবে, ততদিন পালিত হবে দীপাবলী।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom