Breaking Posts

6/trending/recent
Type Here to Get Search Results !

ধর্মান্তরিত দলিত খ্রিস্টান ও মুসলিমদের সংরক্ষণ দেওয়া উচিত নয়

Representative Image(Credits: Scroll)


© শ্রী রঞ্জন কুমার দে

জাতিভেদ প্রথা ভারতীয় উপমহাদেশে ক্যান্সারস্বরূপ, এটা একদিকে সমাজের একাত্মতাকে যেমন ধ্বংস করছে, ঠিক তেমনি ভ্রাতৃত্বের মধ্যে কৃত্রিম দেওয়ালের আবরণ তৈরি করছে।ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখ্যা, সনাতনী ও বুদ্ধিজীবীদের উদাসীনতা, সমাজের তৃণমূল স্তরে সরকারি জাগরণতার অভাব, রাজনৈতিক ফায়দা, প্রকৃত শিক্ষা এবং নৈতিকতার অভাব প্রভৃতি কারণই জাতিভেদ প্রথা সমাজে মাথাচাড়া দেওয়ার মুখ্য কারণ। জাতিভেদ প্রথার ছোঁয়াচে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষকে কয়েক শতাব্দী থেকে যে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে, সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না এবং সেটা আজকের দিনেও উত্তর ভারত, মধ্যে ভারতে ভয়াবহ আকারে ধারণ করে আছে।

জাতিভেদ প্রথার জন্যই সনাতনী সমাজ বিভক্ত হয়ে দলিত, খ্রিস্টান মিশনারী, আরবীয় সংস্কৃতি, বৌদ্ধদর্শ, জৈন, শিখের ছায়ায় আশ্রিত হয়েছে বা বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু গীতায় ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন,"চাতুর্বনং ময়া সৃষ্ট্যং গুণ কর্ম বিভাগসঃ"। অর্থ্যাৎ চারটি বর্ণ সৃষ্টি হয়েছে গুণ ও কর্মের বৃত্তিতে। কর্মনুযায়ী যাহারা শাস্ত্র রচনা করবে তাঁহারা ব্রাহ্মণ, তাঁহার পিতা বৈশ্য হলেও সে ব্রাহ্মণ। অস্ত্র চালনা করলে তাঁহারা ক্ষত্রিয়, তাহাদের পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণ হলেও তাঁহারা ক্ষত্রিয়।প্রকৃতপক্ষে সনাতন শাস্ত্রে জাতপাত বিভাজনের কোন স্থান নেই, প্রমাণস্বরূপ মহাভারতে কৃষ্ণের কোন পদবি নেই, অর্জুনেরও নেই। পুরুষোত্তম ভগবান রামেরও কোন পদবি নেই। নমঃশূদ্র জাতির গোত্র যেমন কাশ্যপ, চট্টোপাধ্যায়দের গোত্রও কাশ্যপ, স্বামীজী এবং সংঘ প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর হেডগেওয়ারজীর গোত্রও কাশ্যপ। অর্থাৎ এঁরা সবাই কাশ্যপ ঋষির সন্তান, এমনিভাবে আমরা সনাতনী সবাই কোন না কোন ঋষির বংশধর। তাই আমাদের অমৃতপুত্র বা ঋষিসন্তানও বলা হয়। 

সমালোচকরা সর্বদা সনাতন সংস্কৃতিকে ব্রাহ্মণবাদীরূপে আখ্যায়িত করে থাকেন, কিন্তু বাস্তব সমীকরণ ভিন্ন। বেদের লিপিবদ্ধা ব্যাসদেব ব্রাহ্মণ ছিলেন না, পৈতা ধারণে গায়ত্রী মন্ত্র জপের দ্রষ্টা মহর্ষি বিশ্বামিত্রও ব্রাহ্মণ নন, দেবতারা যে দধিচি মুনির আত্মত্যাগে স্বর্গ পুনরুদ্ধার করেন উনিও শুদ্র ছিলেন, দক্ষিণ ভারতের উদ্ধারকর্তা অগস্থা মুনিও শুদ্র ছিলেন, মহর্ষি বাল্মীকি মুনিও ব্রাহ্মণ ছিলেন না যেখানে উত্তরপ্রদেশেও আজও তাঁদের ঘোর দলিত হিসাবে মানা হয়। এরকম অগণিত উদাহরণ আছে যাহার দলিলস্বরূপ কখনো সনাতন সংস্কৃতিকে ব্রাহ্মণবাদীরূপে আখ্যায়িত করা যায় না।

শৈব শ্রী সংকরচার্য জাতপাত ভেদাভেদ সম্বন্ধে স্পষ্ট লিখে গেছেন-

     "ন মৃত্যুর্ণ  শঙ্কা ন মে জাতি ভেধাহঃ (নির্বাণ-ষটকম:৫)।

     অর্থাৎ"আমার কোন মৃত্যু নেই,শঙ্কা নেই এবং কোনপ্রকার জাতিভেদ নেই।"

      দূরদর্শী ভারত সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ অনেক আগেই মন্তব্য করে গেছেন,"হিন্দু কখনো হিন্দুর নিকট অস্পৃশ্য হইতে পারে না। হিন্দুতে হিন্দুতে মিলন ও ঐক্যের মধ্যে দিয়াই হিন্দু জাতি অসীম শক্তির অধিকারী হইবে।"

প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রে দলিত শব্দটির কোন জায়গাই নেই যেখানে রামায়ণে শ্রীরাম শর্বরীর উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করেছেন, বাল্যসখা নিষাদ রাজা গুহক এবং রামচন্দ্রের আত্মার নিবিড়তা দেখতে পাই।কিন্তু বাস্তবে জাতপাতের ঘৃন্য মানসিকতার উপরে উঠে আমরা প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি এবং সনাতনী সমাজকে এক ভঙ্গুর অবস্থায় খাড়া করিয়েছি। উদ্ধাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালে বিহারের তৎকালীন দলিত মুখ্যমন্ত্রী জিতেন রাম মাঝি একটি মন্দির দর্শন করার পরে পুরো মন্দির ধুঁয়ে পবিত্র করা হয়। গত ৮ই সেপ্টেম্বর কর্ণাটকের কোলার জেলায় ১৫ বৎসরের এক দলিত  পরিবারের ছেলেকে শুধুমাত্র মন্দিরের দেবতা স্পর্শ করার অপবাদে গোটা পরিবারটিকে ৬০ হাজার টাকার জরিমানা করা হয় নতুবা গ্রাম ছেড়ে বের করে দেওয়া হবে, এমনবস্তায় সহায় সম্বলহীন অসহায় মা শোভাম্মা আম্বেদকরের ছবি টাঙিয়ে পূজো করবেন বলে স্থির করেছেন।গত ৫ই অক্টোবর রাজস্থানের বারাং জেলায় মা দুর্গার আরতি করায় দুই দলিত যুবককে মারধর করা হয়,পরে পীড়িতরা পঞ্চায়েত স্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির দরজার কলকাঠি নাড়লেও কোন সুবিচার পায় নি।অবশেষে ঐ গ্রামের ২৫০লোকের দলিত পরিবার হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে নেয়।এরকম বিবেকহীন ঘটনা দেশের কোন না কোন প্রান্তে প্রায় প্রতিদিনই দলিতদের উপর ঘটেই চলছে। দলিত নিপীড়নই ধর্মান্তকরণের প্রধান অন্তরায়, স্বামী বিবেকানন্দ 'প্রবুদ্ধ ভারত' নামক ইংরেজি পত্রিকায় জনৈক এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, "কোন লোক হিন্দু সমাজ ত্যাগ করিলে  সমাজে শুধু যে একটি লোক কম পড়ে, তাহা নয়; একটি করিয়া শত্রু বৃদ্ধি হয়।" সংঘপ্রধান মোহন ভগবৎজি প্রত্যকটি বৌদ্ধিকে বলছেন বর্ণবাদ বা জাতিবাদের মতো প্রথা ভারতীয় সমাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। এমন কোন প্রথা থাকা উচিত নয় যেটি সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে।

                দলিত শব্দটিকে সংবিধানে উপস্থাপনা করা হয়েছে তফশিলি জাতি-উপজাতি হিসাবে। খোদ বাবাসাহেব আম্বেদকর স্বীকার করেছেন প্রায়  400 C. E. থেকে ব্রিটিশদের সৌজন্যেই আমাদের সমাজে দলিত অপসংস্কৃতির উপনিবেশ ঘটেছে, তৎকালীন ব্রিটিশদের  জনগণনায় নিষ্পেষিত হিন্দু সমাজকে প্রথম দলিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বৃহত্তর হিন্দু সমাজে দলিত নিপীড়নের সংস্কারের উপায়স্বরূপ ১৯৫০ সনে ৩৪১ অনুচ্ছেদনুযায়ী তৎকালীন রাষ্ট্রপতির নির্দেশে সমাজের অস্পৃশ্য, বহিস্কৃত হিন্দুদের অনুসূচিত জাতি তথা দলিত শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর শিখদের দাবি অনুযায়ী ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রপতির আরেকটি নির্দেশে অস্পৃশ্য ও বঞ্চিত তালিকায় দলিত শিখদেরও যুক্ত করা হয়। সবশেষে ১৯৯০ সালে  কেন্দ্রের বিপি সিং সরকারের আমলে নববৌদ্ধ সম্প্রদায়কেও অনুসূচিত জাতিতে অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আরেকটি নির্দেশিকাতে স্পষ্ট বলা হয় যে হিন্দু, বৌদ্ধ, ও শিখ ছাড়া অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অনুসূচিত জাতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কারণ বিশেষত মুসলিম এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জাতিভেদ প্রথা না থাকায় সেখানে সামাজিক ভেদাভেদেরও ইস্যু আসছে না,অর্থাৎ কোন দলিত এই দুই সম্প্রদায়ে ধর্মান্তরিত হলেই আইনগতভাবে ওরা অনুসূচিত জাতির অনুমোদন পাচ্ছে না।

 কিন্তু ২০০৪ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত অনেক মুসলিম এবং খ্রিস্টান সংগঠন সাচ্চার কমিটি ও রঙ্গনাথ মিশ্র আয়োগের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে শিখ ও বৌদ্ধদের মতো ধর্মান্তরিত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের অনুসূচিত জাতিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি করে আসছে। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র সরকারকে রঙ্গনাথ মিশ্রের সুপারিশ সম্বন্ধে নিজেদের অবস্থান জানতে চাইলে সরকার স্পষ্ট জবাব দেয় যে মুসলিম এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে কোন জাতিভেদ প্রথা নেই, তাই তাদের কোনোভাবেই অনুসূচিত জাতিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নই আসে না। একাধিক আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট আবার কেন্দ্র সরকারকে এই চলতি বৎসরের ১১ই অক্টোবর একই বিষয়ে নিজেদের অবস্থান সম্বন্ধে জানতে চায়, কিন্তু কেন্দ্র সরকার এর আগেই পূর্ব চিফ জাস্টিস কে. জি.বালাকৃষ্ণন এর অধ্যক্ষতায় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। যেটি আগামী দুই বৎসরের মধ্য সরকারকে রিপোর্ট করবে ধর্মান্তরিত মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে কি সত্যিই অনুসূচিত জাতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না! কিন্তু বিরোধীরা অভিযোগ করছে এটা সরকারের একটা চক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টকে প্রভাবিত করে রায় বিলম্বিত করার। তবে দলিত আদিবাসী সংগঠনগুলির বক্তব্য হচ্ছে যে খ্রিস্টান, মুসলিম সম্প্রদায় সর্বদা নিজেদের জাতিভেদমুক্ত দাবি করে আসছে এবং এটাকে সার্বজনীন করে তাহারা হিন্দু সমাজ থেকে ধর্মান্তরিতও করছে।কোনদিন এমনও শোনা যায় নি যে দলিত মুসলিম কিংবা খ্রিস্টান কোন উচ্চবর্ণের দ্বারা নির্যাতিত হতে। তাছাড়া পিছিয়ে পড়া মুসলিম বা অন্য সম্প্রদায়ের জন্য ওবিসি কোটাতে সংরক্ষণের বিধানও রাখা হয়েছে। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কোন যুক্তিতে তাহারা আবার তফশিলি জাতিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য সুপ্রিমকোর্ট এবং কেন্দ্র সরকারকে চাপ দিচ্ছে। এমনটি কার্যকারী হলে দেশের খ্রিস্টান মিশনারী এবং জেহাদি সংগঠনদের ধর্মান্তকরণের দাপট আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। এমনবস্তায় সরকার এবং সর্বোচ্চ কোর্টের উচিত দেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে তফশিলি জাতিতে অন্তর্ভুক্ত না করা।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Ads Bottom